This entry is part 7 of 8 in the series এখানেই গল্পের শেষ নয়

পর্ব- ৭

সারা রাত অপমানের জ্বালায় পুড়ে পুড়ে ভোরের দিকে অদ্ভুত এক ক্লান্তিতে ঘুম এসে গেছিল, বিভার। ঘুম যখন ভাঙল … তখন ঘড়ি বলছে প্রায় এগারোটা… বিছানায় উঠে বসলো বিভা । গায়ে হাতে অসহ্য একটা ব্যাথাও টের পেল। বিধ্বস্তভাবে পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরের আকাশটার দিকে চেয়ে রইল, …গত রাতের কথাগুলো মনে হতেই এক অফুরান বিস্বাদে ভরে গেল মনটা … ভাবল ইশশশশ্‌ কেন যে ভাঙল ঘুমটা। ঘুমটা যদি না ভাঙত কত ভালো হত… মুক্তি ই মুক্তি… চরম তৃপ্তি । কিন্তু পরক্ষণেই বিভার মনে হল, এত সহজে সে ছেড়ে দেবে অতীনকে? নাহ কিছুতেই না। অতীন তার ইচ্ছমত যা খুশি তাই করবে বিভার সাথে আর সে মেনে নেবে ? না… যে লুকোচুরি খেলা অতীন শুরু করেছে , সেই খেলার শেষ বিভাই করবে । বিছানা ছেড়ে উঠে ঘরের দরজা খুলে বাইরে গেল বিভা, পাশের ঘরের দরজা খোলা, ঘরটাও মোটামুটি গুছোনো… কিচেন ফাঁকা , লিভিং ফাঁকা … ব্যালকনির দরজা লাগানো … দরজার কাচের মধ্যে দিয়ে যতদূর চোখ গেল, খোলা এক বুক আকাশ যেন উপুর হয়ে আছে বিভার ব্যালকনির ছাদে। বেশ একটা মেঘলা মেঘলা ভাব… শীতের শুরুতে ঠান্ডা ফেলার জন্য একটা নিম্নচাপ হতে পারে, আকাশটা যেন তেমনি নির্দেশ দিচ্ছে , কেমন একটা থমথমে ভাব । লিভিং থেকে ফিরে এসে বিভা দেখল, বাথরুমের দরজা খোলা। নিজের ঘরে এল বিভা… কাল এই খাটটায় অতীন শুয়েছিল একা , তাকে ঢুকতে দেয়নি ঘরের দরজা বন্ধ রেখে। বিভা খাটের কোণায় বসল …উদাস হয়ে চেয়ে রইল খাটের পিছনের দেওয়ালে রাখা একদল ছুটন্ত ঘোড়ার ছবির দিকে, মনে মনে ভাবল, আচ্ছা সে কি এমন অন্যায়টা করেছিল? অতীন কি চাইলে পারত না একবার তার দরজায় এসে দাঁড়াতে ? আজ পর্যন্ত বিভা ঝগড়া কখনো বাসি করে নি, নিজের দোষ না থাকলেও , গোঁ ধরে না থেকে মিটিয়ে নিয়েছে নিজে থেকেই। এই প্রথম সে নিজে থেকে এগোতে পারল না, কিন্তু কই অতীনও তো এগিয়ে আসলো না , কিন্তু সত্যিই কি অতীন নিরপরাধ, তার কি উচিত ছিল না বিভার সাথে খোলাখুলি কথা বলা? … এক মুহূর্ত আরো কি যেন ভাবল বিভা ? তারপর তার মনে হল অতীন গেল কোথায়? তবে কি…চলে গেল …তাকে ফেলে? আচ্ছা অতীনের অফিসের ব্যাগটা কই ? স্টাডি টেবিলে চোখ পড়তেই… বিভা দেখল ব্যাগ নেই …আলমারি খুলে হলুদ ফাইলটাও চোখে পড়ল না বিভার। তারপর মনে হল …ওহো আজ তো অতীনের অফিসে স্মল স্কেল ইন্ডাস্ট্রি গ্লোবালাইজেশানের জন্যে ফরেন ডেলিগেটসদের সেমিনার… আর এই মিটিংএর জন্যই তো কাল বাড়ি বসে সে ফাইনাল রিপোর্ট তৈরি করছিল, সন্ধ্যেবেলা ব্রজেশ্বরদার ফোন এসেছিল… অতএব অতীন অফিসেই গেছে । তাছাড়া ছেলেরা খুব আরাম প্রিয়, তাদের সাজানো বাগান ছেড়ে তারা অন্য বাগানে ঘুরতে যেতে পারে কিন্তু সন্ন্যাস নিয়ে সহজে পাহাড়ে যেতে পারে না। তার জন্য সমস্ত ইন্দ্রিয় সুখ ছাড়তে হয়। অতএব অতীন বাবু আর যাই হোক বিবাগী হতে পারে না… । তবু একবার সুনিশ্চিত করনের জন্য অফিসের নম্বরে ফোন করল বিভা ল্যান্ডলাইন থেকে,
-হ্যালো
-হ্যা-লো, কি চাই?
-আচ্ছা সেলস ডিপার্টমেন্টের অতীনবাবু কি আজ এসেছেন?
-হ্যাঁ , এসেছেন , কিন্তু এখন সিটে নেই … আপনি কে বলছেন ম্যাডাম? হ্যালো হ্যালো …

কিছু না বলেই ফোনটা কেটে দিল, বিভা ।তারপর মনে মনে হাসল …. যা ভেবেছিল , ঠিক তাই। মোল্লার দৌড় ওই মসজিদ পর্যন্তই । নাহ, তাহলে অতো চিন্তার কোনো কারণ নেই, অতীনবাবু এখন অফিসে নিজের ভাবমূর্তি বজায় রেখে হেসে হেসে কাজ করে যাচ্ছে … আগের দিন রাত্রিতে সে যে মিথ্যে সন্দেহে তার বউয়ের গায়ে হাত তুললো, কেউ জানলই না। বিভা মফস্বলের একটা সাধারণ মেয়ে… যার জগতটাও খুব খুব ছোট … তবুও মুখোশের আড়ালে থাকা এই মানুষগুলোকে সে কোনদিনই সহ্য করতে পারত না… আজও পারে না। তাই নরম স্বভাবের মেয়েটা হঠাৎই কেমন প্রতিবাদী হয়ে উঠল নিজের অজান্তেই।

ওদিকে অতীনের মাঝরাতে সেই যে ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল, সত্যি বলতে আর সে ভাবে ঘুমটা আসেই নি, একটা অপরাধবোধ তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। বিভাকে তার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু এক এক সময় নিজের অক্ষমতার কারণে হারিয়ে ফেলার ভয়ও হয়, তখন কেমন একটা অধিকারবোধ, আধিপত্য, প্রকারন্তরে গোঁয়ারতুমি পেয়ে বসে। মনে হয় এই নীল বোধহয় তার এমন সাজানো সংসারটাকে চোখের পলকে ওলোটপালোট করে দিল। রাগ হয়… কিন্তু তারপর ভাবে না বিভা ওরকম নয়… কিন্তু বিভা নীলকে নিয়ে বেশি উৎসাহ দেখালে একটা হিংসেও হয়। … কিন্তু এর মানেটা তো এইটাই যে সে বিভার প্রতি যথেষ্ট সচেতন, সেটা কি ভালোবাসা নয়…!!! কিন্তু বিভা কি তা বোঝে না ..বিভার বাচ্চাদের প্রতি এতো ভালবাসা আর তার নিজের অপারগতা… এই দুয়ের দ্বন্দ্বে সে কিভাবে বিভাকে যে আসল সত্য বলবে বুঝে উঠতে পারছিল না, যার ফলে দিনকে দিন অতীন যেন কেমন অসহায় হয়ে উঠছিল। একটা অদ্ভুত আশঙ্কা নীল কে নিয়ে তার মাথায় চেপে বসছিল , হয়ত অহেতুক কিন্তু ভাবনাটা যে নামছিল না মাথা থেকে।…এইসব নানা কথা ভাবতে ভাবতে তার সারারাত আর ঘুমই হল না, সকাল বেলা উঠে বিভার ঘরের সামনে গিয়ে বিভাকে ডাকতেও কেমন একটা কুন্ঠাবোধ হল তার, শেষ পর্যন্ত বিভা উঠছে না দেখে নিজেই নিজের কাজ গুছিয়ে, স্নান করে কিছু মুখে না দিয়েই অফিসে বেরিয়ে গেল। ভাবল, অফিস ক্যান্টিনে কিছু খেয়ে নেবে ক্ষণ …আর পরে সময়মত বিভাকে ফোন করে নেবে।

একদিনের একটা ঘটনা পরিবারের দুটো মানুষের মধ্যে কতটা দেওয়াল তুলে দিয়েছে এই কথা ভাবতে ভাবতে বেশ কিছুটা সময় আলগোছে বয়ে গেল বিভার । সাতপাঁচ অনেক ভেবেও বিভা কোনো কূলকিনারা পেল না… অগত্যা, সে ওয়াশ রুমে গেল… গিজার অন করল, বেসিনের সামনের আয়নায় চোখ পড়তেই দেখল ঠোঁটের কোনে কালশিটে একটা দাগ। … হাতের দু একটা জায়গাতেও একইরকম দাগ… চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিল। কালকে অতীনের খামচে ধরা জায়গাগুলো নখের আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল , সেখানে জলের ছিটে লাগতেই কেমন একটা চিড়বিড় করে উঠল … হয়ত বা মনটাও জ্বালা করে উঠল।…কিন্তু এত কিছু দেখেও তার একটু কাঁদতে ইচ্ছে করল না…চোখের সব জল কি শুকিয়ে গেল তার? মনে মনে ভাবল বিভা … একটা রাতে সে কি এতটাই বদলে গেল?… কই আজ তো তার অতীনের জন্য একটুও অনুকম্পা হচ্ছে না… তিন বছর যে লোকটার সাথে ঘর করল তার প্রতি এতটুকুও কৃতজ্ঞতা আসছে না বিভার ! বরং নীলের কথা তার মনে পড়ে যাচ্ছে অতীনকে ছাড়িয়ে। সে ভাবতে চেষ্টা করল নীলের জন্য কি অনুভুতি হচ্ছে তার? … এই কথাটা ভাবতেই মনে হল… ‘ ওহো নীলকে একটা ফোন করতে হবে? ‘যাক স্নানটা তো সেরে নি আগে ’…
অনেক্ষন ধরে ঠান্ডাগরম জলে স্নান করল বিভা … স্নান সেরে বাইরে এসে একটা ঘন জাম রঙের তাঁতের শাড়ি পরল … ইচ্ছে করল না কপালে সিঁদুরটা ছোঁয়াতে , ভিজে চুলটা আঁচড়ে, একটু সাজল নিজের জন্যে , …এতকাল তো সে অনেক সেজেছে অতীনের জন্যে ,… আজ মনে হল একটু নিজের জন্য বাঁচতে , কিচেনে এসে এক কাপ কফি বানাল বিভা , তারপর মোবাইলটা খুলে সবার প্রথম নীলকেই ফোনটা করল
-হ্যালো… নীল
-উফফফফ… মেমসাহেব… বলো ফোন করলে তবে?
-হুম…
-বিশ্বাস কর , এই কদিন মনে হয়েছে কি এক নির্বাসন দিয়েছ যেন তুমি আমাকে, বুকের মধ্যে একটা ভারি পাথরের চাপ… এখন তোমার কণ্ঠস্বরে বেশ হাল্কা লাগছে… কি হয়েছিল তোমার। আমায় বলবে না?
-বলব , তাই তো তোমায় ডাকছি নীল… আজ এক্ষুনি আমার বাড়ি আসতে পারবে কি ?
-মজা করছ?
-না সত্যি… পারলে এখনি এসো… অনেক কথা বলার আছে।
-এখনি? কি হয়েছে বল তো? অতীনদা আছে তো ?
-না ও অফিসে। তুমি যদি এখনি আসো… তবে কথা হবে , না হলে, আমাকে আর তুমি ফোন কর না নীল।
-এরকমভাবে বলছ কেন? আচ্ছা তুমিই বলো… অতীনদা নেই আমার যাওয়াটা কি ভালো দেখাবে?
-আমি আজ খুব বেপরোয়া নীল… হয়ত বা মন থেকে স্বৈরিণীও । আসবে তো এস না হলে ফোন রেখে দিচ্ছি।
-কি বাজে বকছ … আচ্ছা দেখছি …
-না দেখছি না…
-আচ্ছা এইভাবে যাওয়া যায় নাকি?
-খুব যায়… চাইলেই যায়। তুমি চাও না তাই বলো।
-না ঠিক তা নয়… আচ্ছা যাচ্ছি… কিন্তু এখন তো পৌনে বারোটা , আমাকে কিন্তু দুটো আড়াইটের মধ্যে ফিরে আসতে হবে …ভালো করে ভেবে দেখ তোমার অসুবিধে হবে না তো?
-না …বললাম তো… তাহলে এস… আমি তোমার অপেক্ষায় রইলাম।
বিভা ফোন কেটে দিল ।
নীল একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে গেল।তারপর ঘড়ি দেখে ভাবল, সময় কম। নিজের কাজগুলো একজন সহকর্মীকে একটু দেখে দিতে বলে, নীল হসপিটাল থেকে বেরিয়ে পড়ল… একটা ট্যাক্সি ধরল… বিভার বাড়ি তার কর্মক্ষেত্র থেকে খুব দূরে নয়…মনে মনে ভাবতে থাকল কি হয়েছে বিভার। এই কদিনে সে যতটা চিনেছে তাকে ,সহজ বলেই তো মনে হয়েছে । সত্যি বলতে তার ইমলির সাথে সম্পর্কটা এখন দুই বাড়ির কথা রাখতে গিয়ে একপ্রকার দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে , কিন্তু মনের খিদেটা সে বিভার সাথে কিছুটা হলেও ভাগ করে নিয়েছিল… কিন্তু আজ এমন কি হল যে বিভা তাকে ডেকে পাঠালও। ভাবল অতীনদাকে কি একবার ফোন করবে? পরক্ষনেই মনে হল, ‘না ,আগে দেখি তো কি হয়েছে, হয়ত দুজনের মধ্যে ঝগড়াঝাটি কিছু হয়ে থাকবে,…তাই হবে… সে যেমন ইমলির জন্য বিভাকে বলে, হয়ত বিভাও তেমনি অতীনদার জন্যে তাকে কিছু বলবে… ঠিক আছে নো প্রবলেম, দেখাই যাক না কি বলে?’

  
This entry is part 2 of 8 in the series এখানেই গল্পের শেষ নয়

পর্ব – ২

‘এক কাপ চা করতে কত সময় লাগে বিভা’? …খবরের কাগজ হাতে অতীন এসে দাঁড়ালো কিচেনে। ঘড়ি বলছে বেলা এগারোটা সাতচল্লিশ ।অতীন দেখল বিভা একটা ছোটো ট্রেতে দুটো চায়ের কাপ সাজাচ্ছে।
অতীন বলল , থাক অত গুছিয়ে গাছিয়ে দিতে হবে না … হাতেই দাও।
বিভা একটু ইতস্তত করে অতীনের হাতে চায়ের কাপটা তুলে দিয়ে বলল, …না চা টা একটু ভিজতে দিয়েছিলাম। …এই নাও ধরো।
অতীনের হাতে একটা কাপ ধরিয়ে দিয়ে, নিজের চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে, অতীনের পাশ কাটিয়ে বিভা কিচেন থেকে ডাইনিং এ এসে বসল। তারপর পিছনে ঘুরে অতীনকে একটু অন্যমনস্কভাবে চায়ের কাপ হাতে কিচেনের জানলার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল ,
– কি গো তুমি আবার কি ভাবছো , ওখানে দাঁড়িয়ে রইলে যে, এদিকে এসো না?
চায়ে এক চুমুক দিয়ে, অতীন বলল ,
– ভাবতে তো চাইছি না বিভা …কিন্তু ভাবাচ্ছে!
-কে?
-তোমার আচরণ ।
-মানে?
-দিন কে দিন তুমি কেমন যেন বদলে যাচ্ছ বিভা!!! সারাদিন কেমন একটা আনমনা হয়ে থাকো। কি যে ভাবো তুমিই জানো…একটা ঘোরের মধ্যে থাকো …কোনও কিছুতেই খেয়াল নেই। …কি ভাবো বলতো ?
-দুররর… কি আবার ভাববো।
-আরে ভাবো , ভাবো…আমি বলছি। আর কি ভাবো আমি বোধহয় একটু হলেও বুঝতে পারছি, ইদানীং।
-না আমি কিছুই ভাবি না…আর তাছাড়া ভাবার মত আছেটাই বা কি?
দুজনের কথার মাঝে ল্যান্ডলাইনটা বেজে উঠলো।বিভা চেয়ার ছেড়ে উঠে লিভিং স্পেসের সাইড টেবিলে রাখা কর্ডলেসটা ধরল…
-হ্যালো।
-তুমি মোবাইলটা খুলবে নাকি আমি এখানেই কথা বলব?
নীলের ফোন বুঝতে পেরেও অশান্তির ভয়ে ,বিভা চুপ করে রইল। অতীন বলল,
-কে ফোন করেছে?
বিভা ফোনটা নামিয়ে রেখে বলল, ‘জানি না কিছু শোনা গেল না …কেটে গেল লাইনটা’।
অতীন একটু ঠান্ডা চোখে জরীপ করল বিভাকে।
বিভা তার অস্বস্তি ভাবটা কাটিয়ে ফাঁকা কাপ দুটো হাতে নিয়ে কিচেনে যেতে না যেতেই আবার বেজে উঠল ফোন। এবার অতীন নিজেই ফোনটা ধরল। বিভা মনে মনে প্রমাদ গুনল… আগাম ঝড়ের পূর্বাভাস শুনতে পেল তার মনের অতলে…
-হ্যালো কে বলছেন?
-হ্যালো কে অতীন দা? আমি নীল বলছিলাম দাদা । কেমন আছেন?
-ও হো নীল … আমি ওই আছি একপ্রকার …তুমি কেমন আছ বলো …সব ঠিকঠাক চলছে তো?
-হ্যাঁ দাদা… সবই চলছে গড়িয়ে গড়িয়ে…মেমসাহেবের সাথে একটু কথা ছিল দাদা…দেখলাম মোবাইলটা বন্ধ…তাই এখানে ফোন করলাম। কথা বলা যাবে এখন।
-হ্যাঁ হ্যাঁ ধরো দিচ্ছি…অনেকদিন আসোও নি তো? সময় করে এসো একদিন। কথা হবে । …দাঁড়াও ডাকছি বিভাকে।
বিভা ততক্ষণে অপরাধীর মতো মুখে অতীনের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে । অতীন একটু কঠিন চোয়ালে ফোনটা বিভার দিকে এগিয়ে দিল…বিনা বাক্য ব্যয় করে।
ফোনটা ধরেই বিভা একটু গম্ভীর সুরে বলল,
-হ্যালো …কি ব্যাপার ঝটপট বলো …সময় কম …রান্না করছি।
-আমার ফোনটা ধরে বার বার কেটে দিচ্ছ কেন মেমসাহেব…একটু কথা ছিল ইমলির ব্যাপারে।
-শোনো না নীল এখন তো আমি ব্যস্ত আছি… তুমি সন্ধ্যেবেলা ফোন করো, তখন ফ্রী থাকব। কথা বলতে পারব।
-সন্ধ্যেবেলা ? আচ্ছা বেশ্‌… ফোন ধরবে তো তখন। আমার নাম শুনে কেটে দিও না প্লিজ …আমি কথা দিচ্ছি আর ডিস্টার্ব করব না… বাট মোবাইলটা খুলে রেখ প্লিজ । আমি সত্যি ফোন করব না সময়ের আগে ,কিন্তু ফোনটা খোলা না থাকলে দমটা কেমন বন্ধ লাগছে মেমসাহেব…প্লিজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড ।
-আচ্ছা ঠিক আছে…এখন রাখছি পরে কথা হবে। বাই।
ভালো করে কোনো কথা বলা বা শোনার মত মানসিকতা তখন বিভার ছিল না । ফোনটা ছাড়া মাত্রই অতীন বলে উঠল…
-আচ্ছা আমাকে একটা সোজা বাংলা বোঝাবে বিভা ?
-কি ?
-নীল তোমাকে সব ব্যাপারে এতো কেন ফোন করে? তুমি কে হও ওর? দিনের পর দিন ফোনে এত কিসের দহরম মহরম? আজকাল তোমার ভাবগতিক আমার মোটেই ভালো ঠেকছে না বিভা।একটা অপরিচিত ছেলের সাথে হঠাৎ ফোনে আলাপ …আর ব্যাস তারপর থেকেই…

অতীন কে কথা শেষ করতে না দিয়েই বিভা বলে উঠল, …
– ‘আর কতদিন অপরিচিত থাকবে? এতই যদি তোমার আপত্তি ছিল …তবে বাড়িতে ঘটা করে নিমন্ত্রন কে করতে বলেছিল?’
-বাহ…আমার বউ অচেনা একটি ছেলের সাথে দিনের পর দিন ফোনে গল্প করবে..তারপর যখন সেই ছেলেটি দেখা করতে বলবে , তখন বাড়ির বাইরে গিয়ে দুজনে দেখা করবে…কেউ দেখলে কি ভাববে বিভা?
-বাজে কথা কেন বলছ? নীল আমাকে কোথাও দেখা করতে বলে নি…ইনফ্যাক্ট আমাদের কোনদিন দেখা হবে ভাবিও নি … দুষ্টুর অ্যাক্সিডেন্ট টা না ঘটলে হয়ত আমাদের দেখা হতই না…আর তাছাড়া আমি তো দেখলাম নীল কে বাড়িতে আনায় তুমিই বেশি উৎসাহী ছিলে।
-সেটা ভদ্রতা বিভা… না হলে কোথাকার কে একটা ছেলে তাকে বাড়ি ডেকে এনে গল্প মারার কোনও ইচ্ছাই আমার ছিল না।
-কেন আমি তো বলেছিলাম বাইরে কোথাও খাইয়ে দাও…তুমিই তো বেশি বাড়াবাড়ি করে বাড়িতে ডেকেছিলে।
-আমি না ডাকলে তোমরা বাইরে দেখা করতে … করেছিলে তো।
-মোটেই না। ওটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট।
-তুমি সিওর !!! ওটা ডেটিং নয়???
-ভদ্রভাবে কথা বলো অতীন।
-আচ্ছা তুমি কি ভদ্র কাজটা করছ?
-প্লিজ চুপ কর। আমার ভালো লাগছে না…
-হ্যাঁ তা লাগবে কেন? এখন আমার সাথে কথা বলতেই তোমার ভালো লাগে না… আমি জানি বিভা।
-প্লিজ অতীন এভাবে বলোনা…আচ্ছা কেন বলতো, বাইরের একটা ছেলে কে নিয়ে আমরা নিজেদের মধ্যে এমন একটা ঝগড়া করছি।
-তুমি সেটা বোঝো কি?
-হ্যাঁ বুঝি তো, তাই তো আমি ওকে এড়িয়ে চলি আজকাল…ফোন ধরি না , কথা বলি না…বিশ্বাস করো নীলের কোনো অস্তিত্ত্ব নেই আমার কাছে …… আমার তো শুধু তুমি আছো ।…এই নতুন শহরে আমার আর কে আছে বলো ? সত্যি বলতে তুমি না থাকলে আমার বড়ো একা একা লাগে… দুষ্টুটা থাকলে তবুও কিছুটা সময় কাটে কিন্তু তুমি তো আবার দিদিকে বারণ করেছ দুষ্টুকে আমার জিম্মায় রাখতে…
-না না বিভা, দুষ্টু তোমার দিদিভাইয়ের একমাত্র অবলম্বন । তোমার জাম্বো মারা যাওয়ার পর দিদির ওই ছেলে ছাড়া আর কেউ নেই। আর অন্যের সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে পালন না করতে পারলে …নেওয়া উচিত নয় বিভা। দুষ্টুর আরো বড়ো ক্ষতি হতে পারত!!!
-মানছি কিন্তু আমি ওর কোনও অবহেলা করি নি অতীন । আচ্ছা আমরা কি পারি না অতীন আমাদের নিজেদের সন্তানের কথা ভাবতে? এখনও কি সময় হয় নি বলতে চাও…নয় নয় করে আমাদের বিয়ের তিন বছর তো হল… কি বলো তুমি?
-না এখনো সময় হয়নি বিভা … আমাকে একটু গুছিয়ে নিতে দাও। আমি তো বলেছি… সময় আসলে তোমাকে বলতে হবে না…আমিই বলব তোমায়।
আমার রোজ রোজ ওই ওষুধগুলো খেতে ভালো লাগে না অতীন, এবার তুমি আমাকে কনসিভ করতে দাও। আমার ভীষণ একা একা লাগে ।
…কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় বুজে আসে বিভার কণ্ঠস্বর …অতীন পরম মমতায় বিভার মাথায় হাত রাখে…আর এইভাবেই ধীরে ধীরে অতীন আর বিভার সম্পর্কের মাঝের মেঘটা কেটে যেতে থাকে…কিন্তু বিভার মনের মধ্যে তখনো অদ্ভুত এক মিশ্র অনুভুতির যুগপৎ ভাবনার মেঘের সমাবেশ ,যা তাকে প্রবলভাবে অস্থির করে তুলতে থাকে শরীরে মনে ।

……………………..……………………..……………………..…………ক্রমশ

  
This entry is part 1 of 8 in the series এখানেই গল্পের শেষ নয়

 

প্রথম পর্বঃ
আভেনের আঁচটা কমিয়ে দিয়ে জল হাতটা মুছতে মুছতে কিচেন থেকে বেড়িয়ে এল বিভা। ল্যান্ডলাইনটা বাজছিল। বিভা ধরল ফোনটা।
-হ্যালো।
-তোমার মোবাইলটা অফ কেন? ব্যাস্ত আছো?
-হ্যাঁ …কিন্তু তুমি কেন আবার আমায় ফোন করেছো বলতো?
-বেশ করেছি। সব তোমার ইচ্ছে মতই হবে নাকি?
-উফ …নীল। প্লিজ একটু বোঝার চেষ্টা করো।
-কি বুঝব বলতে পারো?
-জানি না…কিন্তু তুমি আর ল্যান্ডলাইনে ফোন করো না।
-তুমি মোবাইলটা খোলো। আমার কথা আছে। এটা কি হচ্ছে তোমার তিন দিন ধরে মোবাইল বন্ধ করে রেখে ?
-প্লিজ দোহাই তোমার…অতীন বাড়ি আছে এখন।পরে কথা হবে।
……ফোনটা কেটে দিয়ে বিভা এসে ডাইনিং এর একটা চেয়ারে বসল। কিচেনের জানলা দিয়ে দূরে দেখা যায় গায়ে গায়ে লেগে থাকা কয়েকটা বাড়ি। আর জানলার চৌখুপড়ি দিয়ে দেখা যাচ্ছে এক চিলতে আকাশ । বিভার এই চারতলার ফ্ল্যাট থেকে আশপাশের বাড়িগুলোকে বেশ নিচু দেখায়। একটা তিনতলা বাড়ির ছাদের অ্যান্টেনায় বসে আছে দুটো কাক। একে অন্যের ঘাড়ের কাছে বসে মাঝে মাঝে মুখ গুঁজে কি যেন করছে … দূরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ক্রমশ আনমনা হয়ে যায় বিভা।মনে পড়ে যায় সেদিনের কথা…যেদিন প্রথম কথা হয়েছিল নীলের সাথে। দুপুরবেলা, খাওয়া সেরে একটু ভাত ঘুম দিয়েছিল বিভা…হঠাৎ মোবাইলে দিদিভাই-এর ফোন… ঘুমটা ভেঙ্গে যায় বিভার…একটু কথা হয়, আভার সাথে। তারপর ঘুম চোখে অতীনকে একটা ফোন করতে গিয়ে বিভা দেখল মোবাইলের ব্যালান্স নেই…অগত্যা খাটের পাশে রাখা ল্যান্ডলাইন থেকে দশটা ডিজিট ডায়াল করতে গিয়ে শেষ তিনটে নম্বর কেমনভাবে যেন ভুল হয়ে গিয়েছিল বিভার …ভুল মানে একটু আগে পরে। কিন্তু সেটা বুঝতে পারার আগেই ফোনের অপর প্রান্তে রিং বন্ধ হতেই বিভা কথা বলতে শুরু করে দিয়েছিল… ‘শোনো আজ ফেরার সময় একটু বাজার করো দেখি… মোচা এনো, বড়ি আর নারকেলও এনো …অনেকদিন মোচার ঘন্ট করিনি… পরশুদিন দিদিভাই আসবে বলেছে, দিদিভাই মোচা খেতে খুব ভালোবাসে…আর শোনো না , আমার এ মাসের পিল নিয়ে এসো…কাল পরশু দুদিন খেলেই কিন্তু শেষ !’
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে ফেলার পর পাল্টা কোনও উত্তর না পেয়ে বিভা ভাবল লাইনটা বুঝি সিগন্যালের অভাবে কেটেই গেছে…সন্দেহ প্রকাশ করে বিভা বলল, যা বাব্বা কেটে গেল নাকি… শুনতে পাচ্ছ ? হ্যালো…
-হুম পাচ্ছি তো… কিন্তু ভাবছি এইসব জিনিসগুলো কোথায় নিয়ে যেতে হবে!
অপরিচিত কন্ঠস্বরে চমকে ওঠে বিভা… ফোনের এলসিডি স্ক্রীনে তখনও জ্বলজ্বল করছে নম্বরটা, যার শেষ নম্বর কটা… ৫৪৫৫ না হয়ে …৫৫৪৫ হয়ে আছে । …ইশশশ, ছিঃ কি ভুলটাই না করেছে বিভা। এইজন্যই ল্যান্ডলাইনে ফোন করতে চায় না সে… লজ্জায় মরে যাচ্ছিল বিভা। একটু চুপ করে থেকে ফোনটা কেটে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন সে। তারপর একটু ধাতস্থ হয়ে ধীরে ধীরে আবার অতীনের নম্বরটা ডায়াল করতে যেতেই , ল্যান্ডলাইন্টা বেজে উঠল …
-হ্যালো…
-হ্যালো…প্লিজ প্লিজ প্লিজ ফোনটা কেটো না মেমসাহেব। আমি নীল…মানে স্বপ্ননীল…বাড়ি ঢাকুরিয়ায় , কর্মক্ষেত্র হরিশ মুখার্জী রোড। আমি কি জানতে পারি , আমি কার সাথে কথা বলছি মেমসাহেব?
বিভা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, ‘ফোন তো আপনি করেছেন আপনিই বলুন কার সাথে কথা বলতে চাইছেন?’
-এইমাত্র যিনি আমায় বাজার করে নিয়ে যেতে বললেন…
-সরি, রঙ নাম্বার হয়ে গেছিল…
-তো কি হয়েছে? হলই না হয় নম্বর ভুল…দুটো কথা বলতে আর আপত্তির কি আছে? হাউ নাইস ইওর ভয়েস ম্যাম…
-আপত্তি আছে বই কি… প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড। আমি অপরিচিত কারোর সাথে কথা বলি না।
-কোথায় অপরিচিত? বললাম যে আমি নীল…বাড়ি ঢাকুরিয়ায়…
-তো এগুলো আমায় বলছেনই বা কেন? আমি তো জানতে চাই নি।
-ওমা কেন মানেটা কি? কি হয়েছে বললে? আমি তো নিজের পরিচয় দিয়েই দিলাম…আর কি অপরিচিত রইলাম? আর ফোনে কথা বললেই কি আমায় বাজে ভাবতে হবে !
-না আমি এসব কিছুই ভাবিনি …বেশ জানা রইল আপনার নাম …এখন কাটুন আমায় দরকারি ফোন করতে হবে?
-খুব দরকারী?
-হ্যাঁ… আরে বাবা যাকে সত্যি বাজার করার কথা বলতে চেয়েছি আগে তাকে তো ফোনটা করি…আপনার সাথে পরে কথা বলব কিনা ভেবে দেখব।
-ওকে…আমার নম্বর তো জেনেই গেছ মেমসাহেব…সময় করে যদি পারো তো কথা বোলো। আমি অপেক্ষায় থাকব কিন্তু।
…আর কোনও কথা বলে নি বিভা । ফোনটা কেটে দিয়েছিল…তবে মনে মনে হেসেছিল এই নীলের কথায়। কিন্তু নীলের কথার মাঝে কিছু একটা ছিল যা বিভাকে ভাবিয়েছিল। আজও সে কথা মনে পড়লে মনে মনে একটা ভালোলাগা ছেয়ে যায় ।
কাক দুটো হঠাৎ তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠতেই ভাবনার রেশটা কেটে গেল বিভার।…পাশের ঘর থেকে অতীন বলে উঠল, ‘কিগো তোমার চা হল?’
হ্যাঁ এই দিচ্ছি।
তড়িঘড়ি আভেনের কাছে গিয়ে দেখল চায়ের জল ফুটে ফুটে একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে, …নিজের মনেই জিভ কেটে আবার নতুন করে চায়ের জল বসালো বিভা।
……………………..……………………..………………… ক্রমশ

  

 

তোর নামের আড়ালে এখনো
কিছু উষ্ণতা রয়ে গেছে বাকি
যা এখনো আমাকে কিছুটা ভাবনা ভাবায়….
হয়তো বা পোড়ায়….
যেদিন শীতঘুমে যাবে
বিষধর প্রেম…..
বিরূপাক্ষের সাধনায়
পাবে আজন্ম মুক্তি ….
সেদিন কি আর এসে যাবে
শুধু অতলে হারাবে কিছু
তুচ্ছ অভিমান
খোয়া যাবে নেহাতই
এক মুঠো কথা….
নেহাত ই এক চিমটে
ভালোবাসা …..

  
PAGE TOP
HTML Snippets Powered By : XYZScripts.com
Copy Protected by Chetans WP-Copyprotect.