This entry is part 5 of 8 in the series এখানেই গল্পের শেষ নয়

পর্ব- ৫

নীলের সাথে বিভার বন্ধুত্বটা হবে না হবে না করেও কেমন যেন দিনকে দিন বেড়ে যেতে থাকে। সারাদিনের কাজের মাঝে টুকটাক এসএমএস … কখনো ধাঁধাঁ , কখনো জোকস , কখনও বা ছোটো ছোটো হাসি ঠাট্টা অভিমান … ফোনের টিং টিং আওয়াজ সব মিলিয়ে বেশ লাগতে থাকে বিভার । কেমন যেন একটা ভরে থাকার অনুভব …সেই একাকিত্বটা এখন আর তাকে তাড়া করে বেড়ায় না। … মাঝে মাঝে নীলের ভুলভাল কথায় তর্ক হয়, রাগ হয় …তখন কিছুদিন কথা বার্তা বন্ধ থাকে , তারপর আবার বিভাই নীলের রাগ ভাঙ্গিয়ে নিজে থেকে ফোন করে। গম্ভীর গলায় নীল বলে,
- ফোন করেছ কেন?
বিভা বলে ,
-রাগ কমেনি দেখছি। আচ্ছা বাবা সরি, ঘাট হয়েছে আমার ,কথা বলতে হবে না …কিন্তু বড়ো বলে একটা সম্মান তো করতে পারো…
তখন নীল বলে,
-তুমি বড়ো বলেই যে সবসময় ঠিক হবে এমন কিন্তু নয় মেমেসাহেব … তুমি বড় হতে পারো কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা তোমার থেকে অনেক বেশি।
নীল যখন রেগে থাকে বিভার কেমন যেন একা একা লাগে… মাঝে মাঝে ভাবে নীলকে জিগ্যেস করবে কেন সেদিন রাতে সে অমন মেঘ জলের এসএমএস করেছিল … কি বলতে চেয়েছিল সে? কিন্তু যখনই বিভা জিগ্যেস করতে যায় কেমন একটা অস্বস্তি তাকে ঘিরে ধরে।
বিভা আর নীলের বন্ধুত্বটা যতটা গভীর হয়ে উঠছিল, অতীন যেন কেমন একা হয়ে যাচ্ছিল। সত্যি বলতে দুটো মানুষের মাঝের সম্পর্কের সুতোটা যখন আলগা হতে থাকে তখন একজন আরেকজনকে কি সত্যি বুঝতে চায়? চায় না বোধহয়… পরিবর্তে আধিপত্য দেখাতে চায়, নিজেকে বোঝাতে চায় … একে অন্যকে দোষারোপ করতে থাকে… যার ফলে দুরত্বটা বাড়তে বাড়তে একজন অপরজনের কাছে দিনে দিনে অপরিচিত হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয় নি। বিভার প্রতি অতীনের আচরণটা ধীরে ধীরে কেমন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠতে থাকে অনাবশ্যক ভাবেই। একটা সন্দেহের জালে বিভার জীবনটা জড়িয়ে পড়তে থাকে… মাঝে মাঝেই অতীন বিভার ফোন নিয়ে কললিস্ট চেক করে , এসএমএস দেখে , … কিছু দেখতে না পেলে বলে , ‘ আগে আগেই সব ডিলিট করে রেখেছ, তাই না?’ অপমানে বিভার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে যায়। আর অতীনের চোয়ালটা কঠিন । বিভা সহজ করার জন্যে অতীনের গায়ে হাত ছোঁয়ালে এক ঝটকায় অতীন হাত সরিয়ে দেয় বিভার । বিভা ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যায়। মুখে কিচ্ছুটি বলে না। মনে মনে অতীনের জন্যে তার মায়াও হয়… ভাবে ,
ধ্যুত আর ফোন করবে না নীলকে । সত্যিই তো কে এই নীল …একটা উড়ো অশান্তি…যার জন্যে অহেতুক অতীন তার থেকে দূরে সরে থাকছে… সন্দেহ করছে…নিজেদের সম্পর্কটা শুধু শুধু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে …কি লাভ আছে তার নিজের সংসারে এমন ঝামেলা করে। অতীনের সাথে জেদাজেদিতে নীলের সাথে কথা বলাটা একটা নেশার মত হয়ে যাচ্ছে তার কাছে অথচ , একটু সহানুভুতির আদান প্রদান ছাড়া আর কিই বা আছে ??? হতে পারে নীল অবিবাহিত বলে তাদের হাসি ঠাট্টা নিয়ে অতীন খারাপ ভাবে কিন্তু বিভা তো জানে তার সীমাবদ্ধতার কথা। তাই গত কদিন ধরে বিভা নিজের সাথে বোঝাপড়া করে , সকাল থেকে ফোনটা বন্ধ করেই রেখেছে। অতীন যা যা পছন্দ করে তাই করবার চেষ্টাও করছে, কিন্তু এতেও কি সামান্য স্বস্তিটুকু পাওয়ার উপায় আছে! একে তো ফোনটা বন্ধ করতে হবে কেন সেই প্রশ্নে অতীন জর্জরিত করে তুলছে উপরন্তু মোবাইল বন্ধ থাকায় নীল এমন ভুলভাল কাজ করছে , যে যা সত্যি নয় তাকেও অতীন সত্যি মনে করতে শুরু করছে।
সন্ধ্যেবেলা আজ অনেকদিন পর অতীন আর বিভা টিভিতে সিনেমা দেখছে একসাথে । আজ অতীন সকাল থেকে অফিসও বেরোয় নি। যদিও বেলায় চা খেতে গিয়ে নীলের ব্যাপারে একটু কড়া কড়া কথা হয়েছে… কিন্তু দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর পরিবেশ একদম ঠান্ডা। অনেকদিন পর আজ একটা ডাকাতিয়া দুপুরের আবেশ এখনও বিভাকে কেমন আদুরে করে রেখেছে। অতীনের গায়ে হেলান দিয়ে দুজনে মিলে একটা কোয়ালিটি টাইম এনজয় করছিল। আঙ্গুলে আঙ্গুল জড়িয়ে সোফায় বসেছিল দুজনে, এমন সময় অতীনের ফোনে তার অফিস থেকে ব্রজেশ্বরদার ফোন এল…স্মল স্কেল ইন্ডাস্ট্রীর লাস্ট সেলস্ ফিগারটা কত? শেষ দুবছরের মার্জিনাল ডিফারেন্স কত ?এইসব জানতেই অফিসের ফোন…। কাল যে অতীনের অফিসে একটা বড়ো সেমিনার আছে । অতীন বিভাকে বলল,
-একটু ফাইলটা এনে দেবে বিভা …
-যাচ্ছি, কোথায় আছে বলো ।
-আমার আলমারির একদম ওপরের তাকে, হলুদ রঙের ফাইল।
-আনছি…
বিভা ফাইলটা আনতে গেল …বিভার আস্তে দেরী দেখে ব্রজেশ্বরদার সাথে একটু কালকের প্ল্যানিং নিয়ে অতীনের কথাও হল। কথা বলতে বলতে অতীন হাঁক পাড়ে,
- কি গো পেলে ?
-হ্যাঁ , দিচ্ছি।
একটু দেরী হলেও বিভা কিন্তু ফাইলটা খুঁজে এনে দিল অতীনকে। তারপর বলে ,
-তুমি কথা বলো, আমি আলমারিটা বন্ধ করে আসছি। পায়ে পায়ে ফিরে যায় বিভা । আলমারির পাল্লার পাশে দাঁড়িয়ে চুপ করে একটা বন্ধ খামে রাখা কিছু কাগজ বার করে পড়তে থাকে বিভা… পড়তে পড়তে বিভার চোখ দুটো জলে ভরে উঠতে থাকে… খামটা একটা ডায়গনেস্টিক সেন্টারের আর কাগজগুলো সাধারণ কাগজও নয়, মায়ো ক্লিনিক্যাল রিপোর্ট – মেল ফার্টিলিটি টেস্ট। যা বলছে, অতীনের স্পার্ম কাউন্ট নরমালের থেকে অনেক অনেক নিচে… এটা পড়ে বিভার একটুও বুঝতে অসুবিধে হল না, তার কনসিভ করতে চাওয়ায় অতীনের বাধাটা আসলে কোথায় ! … এক মুহুর্তের জন্যে বিভার জীবনখাতার আগাম পাতাগুলো সাদা হয়ে গেল… অতীনের অক্ষমতার কথায় যতটা না অনুকম্পা হল , রাগ হল অনেক বেশি । … কারণ সব জেনেও নিজের অসুবিধে গোপন রাখতে সে বিভাকে কামপিলগুলো খেয়ে যেতে বাধ্য করেছে। দিনের পর দিন ওই অসুধ খেয়ে বিভার হরমোনাল ডিসব্যালান্স হত, পাশাপাশি মাথা ঘোরা , গা বমি তো ছিলই। এমনকি তার দিদির কথা শুনে বিভা যখন ,’বলত এই পিলগুলো বেশি খাওয়া ঠিক নয় , পরে কনসিভ করতে প্রবলেম হতে পারে সেটা শুনে অতীন গা করত না।’ তার মানে ও সব বুঝত কিন্তু …. ! এরপর ধীরে ধীরে তার মনে হয় ,এও তো এক মিথ্যের আশ্রয়… এক রকমের প্রতারণা ! যা অতীন দীর্ঘ একবছর ধরে করে আসছে তার সাথে। বিভার মাথায় সব তালগোল পাকিয়ে যায়।মনের মধ্যে একটা উদ্দাম ঝড়ের আভাস টের পায় বিভা। ততক্ষণে অতীন লিভিং থেকে ডাকাডাকি শুরু করে দিয়েছে , ‘ শুনছ … কি করছ… এস না। …কিগো?… বিভা?’ নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করতে থাকে বিভা… তার এই কদিনের সুসম্পর্ক গড়ে তোলার সুচেষ্টাটা ফালতু মনে হতে থাকে… খামটা সযত্নে আলমারির যথাস্থানে রেখে চোখ মুছে ঘরের আলো নিভিয়ে ধীর পায়ে অতীনের কাছে যায় বিভা। তার খুব ইচ্ছে করছিল অতীনকে একবার জিগ্যেস করতে , ‘সত্যি কথাটা এমনভাবে কেন গোপন করলে তুমি? তুমি সহজ কথাটা একবার সহজ ভাবে বলেই দেখতে আমি মেনে নিতে পারি না… চাইলে দুজনে মিলে ডাক্তার কনসাল্ট করতাম,… নিজের অক্ষমতার কথা বলতে পৌরুষে খুব লাগত বুঝি, তাই বোধহয় দুষ্টুকেও আজকাল তোমার আর পছন্দ হয় না… এরকম আরো অনেক কিছুই ভাবলো বিভা, কিন্তু কেন জানি না অতীনকে হাসতে দেখে নিজের কষ্টটাকে ভুলে থাকতে চাইল বিভা। অতীন হঠাৎ বিভার হাত ধরে টেনে বলল,
-বসো না যেমন বসেছিলে… উঠে পড়লে কেন? তারপর বিভার থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ কি হয়েছে তোমার?’ বিভা চুপ করে থেকে বলল, ‘ কিছু না… তুমি চা খাবে?’ অতীন বলল, ‘ নাহ … চলো আজ আমি কড়া কফি করে তোমাকে খাওয়াই। অন্যসময় হলে বিভার হয়ত খুব আনন্দ হত, কিন্তু বিভা শূন্য চোখে তাকিয়ে রইল টিভি স্ক্রীনের দিকে … কফি বানাবে বলে অতীন সোফা ছেড়ে উঠে পড়ল।