ঐমুখের জন্মকথা……

       আমি ঐন্দ্রিলা । জন্মসূত্রে , দেহসূত্রে আমি নারী , হয়ত এটাই আমার একমাত্র পরিচয় হওয়া উচিত ছিল ,  কিন্তু আমার মাঝে এক ভিন্ন অস্তিত্বের খোঁজ নিরন্তর আমাকে অস্থির করে তোলে । আর আমি মনের অতলে হাঁৎরে বেড়াই নিজেকেই? মাঝে মাঝেই এমন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হই, যা আমার জীবনের সমস্ত উত্থানপতনকে ম্লান করে দেয়। আর আমি ভাবতে বসি নিঃসীম ভাবনায়, আমি কে? কি আমার পরিচয়? আমি ছিলাম কোথায় ?  এলাম কেন?  আর যাবই বা কোথায়??? আমার এই চোখ যে আকাশ দেখে, আলো দেখ,   মেঘ দেখে, পাখি দেখে -এই দেখাই কি যথেষ্ট ? তাহলে আমার দেখার সাধ মেটে না কেন ? মন সম্পৃক্ত হয় না কেন ?  কারণ কি শুধুই এই যে … বড় সাবধানী আমার চোখ আর মন । যে মনের দুয়ারে আগল টেনে সমাজের আরোপিত অনুশাসন থেকেই আমাকে গড়ে নিতে হয়েছে  নিজস্ব ভুবন ……কঠোর শৃঙ্খল থেকে খুঁজে নিতে হয়েছে মুক্তির আশ্বাস ।  

……কিন্তু এমনি করেই কেটে গেছে  দিন  , মাস , বছর……আর আমি ভুলে থাকতে চেয়েছি প্রকৃতির অনাড়ম্বর সৃষ্টিমাধুর্যে । যখন আমার দখিনের জানলার পাশে কুহু ডাকা নিমগাছের ডালে ফিঙে এসে দোল খায়, যখন মেঘেদের কোলে বৃষ্টির খুনসুটী দেখে আকাশ হয়ে ওঠে উথাল পাতাল … তখন আমার মন খুঁজেছে ফুলের সৌরভ , সুরের তরঙ্গ , ভোরের  শিশির , দিগন্তের গোধুলি , উন্মুক্ত আকাশ আর বিশ্বাসের দু বর্গফুট নিশ্চিন্ত ঠাঁই । আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আমার এই  নারীজন্ম রূপান্তরিত হয়েছে এক অমলিন নদীজন্মে। প্রবাহের পথে চলতে চলতে এইভাবেই কেটে গেছে কত কত সময় , গড়াতে গড়াতে বেড়েছে রাত , বেড়েছে বয়স। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দে , স্মৃতির প্রহর কেটে,  তুঁষের আগুন জ্বলে উঠেছে  ধিকিধিকি… ছিঁড়ে গেছে বন্ধনের মায়া, ভেঙে পড়েছে শাসনের শৃঙ্খল। এমনি এক চৈত্রের দুপুরে কিংবা পৌষের বিকেলে ঠিক মনে নেই, মনের গভীরে কে যেন ডেকে উঠেছিল আমায়…“ ঐন্দ্রিলা , কেমন আছো তুমি!!!তোমাকে তোমার মত করে দেখিনি কতকাল!!! ভালো আছো তো তুমি ?”

     ভাব গম্ভীর সেই ডাকে চমকে উঠেছিল আমার নিথর শরীর, অগোছালো মনের উঠোন! আমি ভাবতে বসেছিলাম …সত্যিই তো এই যদি থাকা হয় তবে আছি। হ্যাঁ বেঁচেই আছি…… কিন্তু ভালো আছি কিনা ভেবে দেখিনি অনেকদিন , কারণ ভালো থাকা আর না থাকার মাঝে থাকে কিছু সময়ের ব্যবধান মাত্র …সেই ব্যবধানই যে আমাকে ভাবায়,  কখনও কাঁদায়, কখনও হাসায়…আর বলে এরই নাম জীবন… মহাজীবন …মহাসত্য। আর এই মহাসত্যের মধুুভান্ড জুড়ে আছে শুধুই এক অপেক্ষা। যে অপেক্ষা দীর্ঘায়িত হলে মনে বিরহ আসে, বিরহে বিষাদ আসে, বিষাদ অবসাদ আনে , আর সেই অবসাদেই জন্ম নেয় বৈরাগ্য। তাই বিরহের এক নাম যদি মীরা হয়, বৈরাগ্যের অপর নাম রাধা। আর এই বৈরাগ্যের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে খাওয়াতে মনের কোনায়  থৈথৈ উপচীয়মান আবেগকে সংযত করে এবার আমি পাড়ি দিয়েছি এক অন্তহীন পথে। আর এই নাম না জানা পথে বয়ে চলার নামও তো জীবন। যে বহমান জীবনের ফাঁকে ফাঁকে রয়ে যাবে রাধা বা মীরার মতো এক অপার খোঁজ , যাকে হাত বাড়িয়ে নাই বা ছুঁতে পারি , মন বাড়িয়ে তো ছোঁয়াই যায়। 

……..হ্যাঁ আমিই সেই ঐন্দ্রিলা যে একসময় ভাবত,  চাইলে সে নিজের খেয়ালে কিই না হতে পারে …সে চাইলে আকাশ হতে পারে …কিংবা নদী,  কিংবা পাখি…বিরহের অজুহাতে মেঘ হয়ে বৃষ্টি ঝরাতে পারে যেমন, তেমন খুশীর জোয়ারে হতে পারে সোনা রোদ্দুর ।কিন্তু আজ আমার ‘সেই আমির গহনে আলো আঁধারের ঘটল সঙ্গম/ দেখা দিল রূপ , জেগে উঠল রস’…..সৃষ্টি স্থিতি লয় সমস্ত কিছু তোলপাড় হয়ে,  নবজন্ম হল আমার আমি’র ! এ আমি এক নতুন আমি। যে পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে এমন এক কুশীলব যার সকল নারীসত্ত্বার অহংকার চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে জেগে উঠল কিছু মুখ আর মুখোশ !!! 

আজ আমার কোনও নারীজন্ম নেই …নেই কোনও নদীজন্মও…জন্মজন্মান্তরে যা রয়ে গেছে তা একমাত্র মানবজন্ম …যা কেবল মানুষের মনের ঘাত প্রতিঘাতকে তুলে ধরতে চায়নি , চায়নি পশুর পাশবিকতা আর মানুষের মানবিকতার মাঝে ফারাক করতে… শুধু দিতে চেয়েছে , মুখ আর মুখোশের দ্বন্দ্বে নির্বাসিত মানুষকে এক আজন্ম মুক্তির সন্ধান। যে অমৃত কুম্ভের সন্ধান পেলে  জীবনের সব অনুভুতিগুলোতেই নিজেকে রাখা যায় স্থির, দুখেষু অনুদবিঘ্নমনা , সুখেসু বিগতস্পৃহা ।  তখন সব কিছুই বড় চেনা চেনা লাগে। চেনা দুঃখ, চেনা সুখ ,চেনা চেনা হাসি মুখ…” আর সেই মুখের সম্ভারই হল ” ঐমুখ।” 

____________________________________________________________________________________________________________________________

কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০১৯-এ প্রকাশিত হতে চলেছে আমার প্রথম উপন্যাস ‘মনমাঝি’

Monmajhi/oimookh.com

মনমাঝি -ঐন্দ্রিলা মুখোপাধ্যায়  Monmajhi/oimookh.com

প্রকৃতি আর প্রেম চিরকাল আবিষ্ট করে রাখে আমাদের জীবন, আমাদের যাপন। মনের অন্ত্যমিলে নিরন্তর জারি থাকে সমকালীন এক খোঁজ!

কলকাতার মেয়ে শিমুল এক বসন্তের সকালে পা রেখেছিল অরন্যসুন্দরী ঝাড়গ্রামে রাঙাপিসির বাড়িতে। সেখানকার মোহময়ী প্রকৃতির ছোঁয়ায়, ষোড়শী শিমুলের শরীরে মনে ছড়িয়ে পড়েছিল ফাগুনের আগুন। সত্যি বলতে ঝাড়গ্রাম তাকে প্রেম দিয়েছিল যেমন অকাতরে, তেমনি তার সেই ভালোবাসার নেশায় মাখিয়ে দিয়েছিল একরাশ বিষাদ। একসময় জীবন বাঁক নিয়েছিল নতুন খাতে। সেদিনের সেই কিশোরী শিমুল ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল বাসন্তীর এক গ্রামীণ স্কুলের শিক্ষিকা। যার অনুভবে শুধুই নেশাতুর সবুজের হাতছানি আর গ্রামের পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য কিছু করতে চাওয়ার বাসনা। সেই ইচ্ছেটুকুকে সম্বল করে গড়ে তুলেছিল এক সংগঠন। যা ছিল তার জীবনে হাজার বন্ধকের মাঝে মুক্তি। কিন্তু হঠাৎ কোন সে অভিমান তাকে তার এমন সহজিয়া জীবন ছেড়ে নিয়ে যেতে চাইল বিদেশের ঝাঁ চকচকে শহুরে কেতার জীবনে? যে শিমূল জঙ্গল ভালোবাসে, নদী ভালোবাসে,মেঠো সুর ভালোবাসে,সে কেন বাধা পড়তে চাইছে আপোষের জীবনে। সেকি বিদেশের প্রতি আকর্ষণ নাকি স্বেচ্ছা নির্বাসন? ঝাড়গ্রামের পলাশের গৈরিক রঙ -এর মাঝে সে কি খুঁজেছিল, ভালোবাসার আগুন নাকি বৈরাগ্যের ছোঁয়া?? শিমুল, তার ভালোলাগা-অপেক্ষা-স্বপ্ন আর তার আপোষ-অভিমান-লড়াই, মূলত তার ভালোবাসার একাল আর সেকাল, তার জীবন নদীর দুইপাড়ের টানাপোড়েনে তার মন রূপ মাঝি বেছে নেবে কোন সে পথ? যা সমকালীন হয়েও চিরকালীন??

প্রকৃতির বুকে এ এক অন্যধারার প্রেমজ উপাখ্যান

মনমাঝি
ঐন্দ্রিলা মুখোপাধ্যায়

প্রকাশক: দ্য কাফে টেবল
প্রচ্ছদশিল্পী: একতা ভট্টাচার্য

সম্ভাব্য প্রকাশকাল: জানুয়ারি ২০১৯।