This entry is part 1 of 10 in the series মনমাঝি
amar satkahon/oimookh.com

মনমাঝি -ঐন্দ্রিলা মুখোপাধ্যায় monmajhi/oimookh.com

 

পর্ব—১। ____________________________________________________________________________

                রাঙাপিসিকে প্রণাম করে মুখটা তুলতেই তিনি শিমূলকে জড়িয়ে ধরলেন… “বাব্বা এতদিনে মনে পড়ল তবে পিসিকে? দেখতে দেখতে বিয়ের বয়স হয়ে গেল…ভাবা যায় সেই শিমূল! কি সুন্দর দেখতে লাগছে রে তোকে !” … পিসির এমন মন ভোলানো কথায় শিমূলের মুখে একটা হালকা হাসি খেলে গেল। সুর্য তখনও মধ্যগগনে পা রাখে নি।তবুও রোদের তাপ কিছু কম লাগছে না…কোলকাতায় শীত যদিও বিদায় নিয়েছে,কিন্তু এখানে প্রচ্ছন্ন একটা শীতের আমেজ আছে এখনও। পিসি বললেন “চল ,ওপরে চল তোরা ,হাত মুখ ধুয়ে কিছু মুখে দে দিকিনি।”

……………………..……………………..……………………..…ক্রমশ

 

  
This entry is part 2 of 10 in the series মনমাঝি
amar satkahon/oimookh.com

মনমাঝি -ঐন্দ্রিলা মুখোপাধ্যায় Monmajhi /oimookh.com

 

 

পর্ব—২। __________________________________________________________________________________________

 

পাশের ঘরে বাবা আর রাঙাপিসির কথা শুনতে শুনতে শিমূল কেমন যেন একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। দূরে জানলার বাইরে একটা কোকিল সমানে ডেকে যাচ্ছে। জানলা দিয়ে তাকালে একটা আমগাছ দেখতে পাওয়া যায় । এই গাছটার ফল খুব মিষ্টি , শিমূল জানে গাছটার নাম আম্রপালি। তার বেশ মনে আছে এই গাছেরই ছোটো ছোটো ভাঙা ডাল কুড়িয়ে সে আর রুবানদা একবার চাঁচর বানিয়েছিল দোলের সময় , সেই যেবার মাধ্যমিক পরীক্ষার পর এখানে এসে থেকেছিল কিছু দিন ।

………………………………………………………………………………………………………………………………………………ক্রমশ

 

 

  
This entry is part 3 of 10 in the series মনমাঝি
amar satkahon/oimookh.com

 মনমাঝি-ঐন্দ্রিলা মুখোপাধ্যায়  Monmajhi/oimookh.com

পর্ব—৩। ___________________________________________________________________________________________

ঝাড়গ্রাম রেলস্টেশন থেকে বেশ খানিকটা রাস্তা এগিয়ে এসে, বাঁক নিলেই লালগড় রোড । ঝাড়গ্রাম মিউনিসিপ্যালিটির অফিস, সরকারি হসপিটাল এসব ছাড়িয়ে, বাঁদিকে মোড় নিয়ে হাই রোডে এসে পড়ল রুবন আর শিমূল। এন.এইচ-সিক্স থেকে ডান দিকে বাঁকলে রগড়া রোড, সেখান থেকে যত সামনের দিকে এগোতে থাকল লোকালয় পেরিয়ে রাস্তা ক্রমশ ফাঁকা হতে থাকল …চড়া রোদের মধ্যে কেমন যেন একটা ঠান্ডা গরম হাওয়ার মেলবন্ধন… রুবনদার কথায় জানা গেল সামনেই লোধাসুলি, বেশ বড়োসড়ো একটা জঙ্গল।ঘন জঙ্গলের এমাথা ওমাথা ঠাওর করা যায় না ।মাঝে শুধু দুএকটা চেক পোষ্ট পড়ে, রাস্তার দুধারে শুধু গহীন জঙ্গল …..এমন সে অন্ধকার যে বাইরে থেকে কিছু চোখে পড়বার জো নেই….

…………………………………………………………………………………………………………………………………ক্রমশ

  
This entry is part 4 of 10 in the series মনমাঝি
Monmajhi/oimookh.com

মনমাঝি -ঐন্দ্রিলা মুখোপাধ্যায় Monmajhi/oimookh.com

পর্ব—৪

_________________________________________________________________________

সত্যিই ঝাড়গ্রাম শিমূলের জীবনটাকে বদলে দিয়েছিল অনেকটা। তার উড়ু উড়ু মনটাকে নিবদ্ধ করেছিল একটা স্থির লক্ষ্যের দিকে। কিছু করতে চাওয়ার একটা গভীর বাসনা তাকে এমনভাবে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছিল যে এস.এস.সি তে সবাই যখন চাকরীর জন্য নিজের বাড়ির কাছকাছি অঞ্চল খুঁজেছিল, সে তখন স্বেচ্ছায় যেতে চেয়েছিল সুন্দরবনের বাসন্তী ব্লকে ।কোলকাতা ছেড়ে এতদূরে, বাড়ির বাইরে একা থেকে স্কুলে পড়ানোর ব্যাপারে সবাই আপত্তি করেছিল । কিন্তু গ্রামবাংলার নেশা ,সাধারন মানুষগুলোর জন্যে কিছু করতে চাওয়ার প্রবল ইচ্ছা …সর্বোপরি রুবনের প্রতি অগাধ এক শ্রদ্ধা , তাকে উত্সাহিত করেছিল এমন একটা জীবন বেছে নিতে।

………………………………………………….. ক্রমশ 

 

 

  
This entry is part 5 of 10 in the series মনমাঝি
Monmajhi/oimookh.com

মনমাঝি -ঐন্দ্রিলা মুখোপাধ্যায় Monmajhi/oimookh.com

পর্ব—৫। _____________________________________________________________________________

রাতে খাওয়া দাওয়ার পর রাঙাপিসি গাড়ি বারান্দার কোণের দিকের ঘরটায় বাবার শোওয়ার বন্দোবস্ত করল । শিমূলের হাতে সাদা প্রিন্টেড বেডশীট আর পিলোকভার বার করে দিল আলমারি থেকে । শিমূল জানে ওই ঘরটা আগে রুবনদার ছিল।এখন সে আর থাকে না বলে ঘরটা ফাঁকাই থাকে । পিসিদের একতলা দোতলা মিলিয়ে প্রায় ছ’টা ঘর । নিচে পিসেমশাইয়ের বৈঠকখানা ছাড়াও আরেকটা ঘর আছে । তাছাড়া রান্নাঘর ,বাথরুম। কাজের মেয়েদের থাকার জন্য আরও দুটো ঘর আলাদা করা আছে বাগানের দিকে । দোতলায় চারটে ঘর ,ঠাকুরঘর , গোল গাড়ি বারান্দা , বড়ো দালান , বাথরুম …ছাদের সিঁড়ি।

………………………………………………………………………………………………………………………………………………..ক্রমশ

  
This entry is part 6 of 10 in the series মনমাঝি
Monmajhi/oimookh.com

মনমাঝি -ঐন্দ্রিলা মুখোপাধ্যায় Monmajhi/oimookh.com

পর্ব—৬। _________________________________________________________________________________________________

সেই কোন কাকভোরে বাবা আর পিসেমশাই বেরিয়ে গেছে। রাঙাপিসি পুজো সেরে শিমুলের ঘরে এলো …শিমুল তখনও শুয়েছিল খবরের কাগজ নিয়ে। রাঙপিসি বলল “কিরে এখনো শুয়ে আছিস… নে ওঠ , চিন্তা চা নিয়ে আসছে, ওঠ ওঠ…” রাঙাপিসি শিমূলের মাথায় হাত রাখলো …শিমুল রাঙ্গাপিসির হাত ধরে বলল “বোসো না একটু …”পিসি খাটের এক কোণায় বসতেই শিমুল পিসির কোলে মাথা রেখে মুখটা গুঁজে পিসিকে জড়িয়ে ধরলো । শিমুল বরাবর এমনটাই আদুরে । রাঙাপিসি বলল……
“হ্যাঁ রে সবাইকে ছেড়ে এতদূরে চলে যাবি তোর মনকেমন করবে না?”

…………………………………………………………………………………………………………………………ক্রমশ

 

  
This entry is part 7 of 10 in the series মনমাঝি
Monmajhi/oimookh.com

মনমাঝি -মুখোপাধ্যায় Monmajhi/oimookh.com

 

পর্ব-৭। ________________________________________________________________________________________________

রুবনদা যত কাছে আসতে লাগলো শিমুলের অস্বস্তিটা যেন আরও বেড়েই চললো…ক্রমশ শ্বাসটা বন্ধ হয়ে যেতে লাগলো ।রুবনদার চোখের দিকে তাকাতে একটা গভীর লজ্জা আর অপরাধ বোধ কাজ করছে,কিন্তু কেন? সে তো কোনও অন্যায় করেনি,তবু যেন তার নিজেকে বড়ো অসহায় লাগছে…কানটা গরম হয়ে আসছে …ঘাড়ের কাছে একটা শিরশিরানি তার কাঁধ ছুঁয়ে শিঁরদাড়া বেয়ে নেমে যাচ্ছে ।

………………………………………………………………………………………………………………………………………..ক্রমশ

  
This entry is part 8 of 10 in the series মনমাঝি
Monmajhi/oimookh.com

মনমাঝি -মুখোপাধ্যায় Monmajhi/oimookh.com

পর্ব-৮। _________________________________________________________________________________________________

শিমুলের কথা আগে যে কোনওদিন রুবন ভাবেনি এমন নয়,বহুবার তার মনে হয়েছে, ‘শিমুলকে একটা ফোন করি’…কিন্তু ছোটো মেয়ে, যতই হোক মনে একটা আঘাত তো পেয়েছিল , হয়ত নিজের পরিচিত পরিবেশে গিয়ে সেটা ভুলেই যেতে চেষ্টা করবে, পাছে ফোন করলে যদি হিতে বিপরীত হয় … এই ভেবেই শিমুলের সাথে আর তার যোগাযোগ করা হয় নি। কিন্তু যত দিন গেছে আর সময় এগিয়েছে তার মনে হয়েছে, ……

………………………………………………………………………………………………………………………………………………….ক্রমশ

  
This entry is part 1 of 8 in the series চাঁদের পরিক্রমণ
চাঁদের পরিক্রমণ@Oindrila

চাঁদের পরিক্রমণ@Oindrila

সে ছিল এক রাঙা ভাঙা চাঁদ …..

যাকে ছুঁয়ে আমি বুঝতে চেয়েছিলাম কলঙ্কের পরিভাষাটা কি ?….জানি না কথায় কথায় চাঁদকে কতটা ছুঁতে পারব…. কিন্তু এই কাহিনীর তাগিদ এক অন্য কাহিনি যার শিরোনাম জীবন !!!!


মুখবন্ধঃ

আজ অনেক বছর পর মনের তাড়নায় লিখতে বসেছি আমার এক দোসরকে নিয়ে…..আজ পর্যন্ত যখনই লিখতে শুরু করি আমার সব ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে যায় সে…..তাকে এড়িয়ে আমার লেখা অসম্পূর্ণ । তাই ভেবেছি এবার না হয় তাকে নিয়েই কিছু লিখি…… । ধরা যাক তার নাম চন্দ্রিমা…..যদিও তাকে আমরা চাঁদ বলেই জানব….। চন্দ্রিমার একটা কালো মলাটের আখাম্বা ডায়রী ছিল…..আমি তার প্রত্যেকটা অক্ষর পড়ে ফেলেছি। ডায়রীর পাতায় তার প্রত্যেকটা শব্দনির্মাণ আমাকে বুঝিয়েছে সে চিরকাল ই একটু অন্যরকম ….প্রবল জলোচছ্বাসের মধ্যে সে আজন্ম নির্জন দ্বীপ …..আবার দিগন্ত বিস্তৃত রুক্ষ মরুভূমির মাঝে সে অবধারিত শীর্ণ জলধারা……। চাঁদের জোছোনায় আমি সত্যিই চন্দ্রাহত…..। চাঁদের জীবন তিরিশ বছর বয়সে এসে শ্লথ হয়ে গেছে । চাঁদকে দেখলে সুস্থই মনে হয় কিন্তু চাঁদ মানসিক ভাবে বড় অস্থির…..সে অনেক মানুষের মন নিয়ে নাড়াচাড়া করে তবু নিজের মনটাই বুঝে উঠতে পারে না….সবাই যখন হাসে কথা বলে গল্প করে কখনও সে ঐ আনন্দের অনুভূতিতে প্রগলভ হয়ে ওঠে আবার কখনও আনমনা হয়ে যায়……সে হাসে , সাজে, নিত্যনতুন জিনিস কেনে কিন্তু কোনো কিছুতেই যেন পূর্ণতা আসে না ।সম্পৃক্ততার আশায় কি যে খোঁজে তাও জানে না…..সবার মাঝে থেকেও সে একা …….আবার একা থেকেও সে একা নয়……তার দুটো সত্ত্বা….সে মনে মনে কথা বলে বুঝেছে…..তার একটা মন যতটা বাধ্য আরেকটা মন ততটাই বেপরোয়া ।এহেন চাঁদ ছোটোবেলা থেকেই বাবার ক্ষুদে হেল্পার ।বাবা গাছের পাতা ছাঁটছেন, চাঁদ বাবার পিছুপিছু ঘুরছে…..আর টালমাটাল পায়ে গাছের ফুল ছিঁড়ছে…..বলছে…”বাব্বা ফুঃ” বাবাও তেমনি আপাত রাগে বলছেন…..”ছিঃ চাঁদ , ছোটো ছোটো ফুল তুলছ কেন?….তাহলে বড়বড় ফুল গুলো কে তুলবে?” চাঁদ খুশি খুশি গাছের ফোটা ফুলের দিকে তাকিয়ে বলে, “আয়েত্তা তুব্ব”….? একটু এগিয়ে গিয়ে আরেকটা ফুল তুলে , ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে ফেলে দেয় ….এইভাবে ফুল দেখলেই তাকে ছিঁড়তে চাওয়ার বাসনাটা তার মন থেকে অপসারিত হয় চির দিনের জন্যে । ………এটাইবোধহয় ছিল , তার সম্পৃক্ততার উপলব্ধি…..যা তাকে তার সজ্ঞানে, এরপর আর কোনও প্রাপ্তিই এনেদিতে পারে নি । চাঁদ বিশ্বাস করতে চায় পজিটিভিটিতে…যে কোনো ‘না বাচক ‘শব্দ ,যা মনের মধ্যে কৌতূহলের সৃষ্টি করে তাকেই চাঁদ ভেঙে দেখতে চায়…..জানতে চায় কি এমন হিস্ট্রি-মিস্ট্রি-কেমিস্ট্রি আছে তার মধ্যে।

পর্ব ১/


চাঁদের রোজকার পাঁচালীটা যেন একটু বেশি রকম স্বশাসিত…..সে নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকতে একটুও ভালোবাসে না…..তবুও আবর্তনে তো থাকতেই হয়…. চাঁদ এখন একটি বেসরকারী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অধ্যাপনা করে…..সারাদিন ই তার নানান বয়সের মানুষের সাথে ওঠাবসা….শুধু তাই নয় এখনকার এই ছাত্রজীবনটাকে সে ভীষণ কাছ থেকে দেখে বলেই বোধহয় সবসময় একটা তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গী তার অতীত আর বর্তমানের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরী করে দেয়….নচেৎ সে তার কলেজ-বাড়ি- পরিবার সবের মধ্যেই একটা তারতম্য বজায় রেখেই চলতে চায়…..শুধু তার মনের হদিস পাওয়া যায় না…..সে এগিয়ে চলতে চায়….কিন্তু অতীত তাকে কেন জানি না আজও বড়ো পিছু টানে……অতীতের কোন সে অসম্পৃক্ততা আজও তাকে কথার নেশায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়….তা সে বোধ করি নিজেও বোঝে না…..। আজ চাঁদের সকালটা একটু অন্যরকম…কাকভোরে ঘুম ভেঙে যায় তার । শোবার ঘরের দখিনের জানলাটা তার কাছে মুক্তির স্বাদ ।ভোরবেলায় জানলার ভারী পর্দা সরিয়ে অন্ধকারের মাঝে যে আলো ফুটে উঠছিল ,তার আঘ্রাণ নিল চাঁদ । জানলার গ্রিলে মাথা হলিয়ে উদাস চোখে দূরের নারকেল গাছটার দিকে তাকালো ।চাঁদ ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা তার মনে কখন ঝড় ওঠে,কখন মেঘ করে আর কখন বৃষ্টি আসে । চাঁদের জীবনে প্রথম বন্ধু তার বাবা ….তারপর বহু বন্ধু এসেছে….চাঁদ খোঁজে একটা অস্তিত্ব ,যার পাশে থাকায় এক নির্ণিমেষ স্বস্তি……সে সম্পর্কের জটিলতা এড়িয়ে ছোটো ছোটো অনুভুতির পরিবর্তনগুলো বিশ্লেষণ করতে চায় ।সে জানে সম্পর্কের সহজিয়া সুর তো একটাই…..’তুমি খুশী থাকলেই আমি খুশী…এর বাইরে আর কোনো চাওয়া হয় কি ???? …..সকালের রুটিন তার যাই থাকুক খবরের কাগজে একটু চোখ না বোলালে চাঁদের হয় না….আকাশটা আজ বড়ো মেঘলা….বৃষ্টি নামল বলে….আজ তার বেরোতে ভালো লাগছে না…..কিন্ত আজ তাকে ক্লাস নিতে হবে স্ট্রাকচারের…..থার্ড ইয়ারের স্টুডেন্টসদের প্রোজেক্ট সাবমিশান আজ….ভাইভা নিতে হবে..সুতরাং যেতে তাকে হবেই….চাঁদ চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল…..ইচ্ছে অনিচ্ছে মেঘলা আকাশ সব মিলিয়েই সে যেন অতীতের সেই দিনটাকে আরও একবার ফিরে দেখতে চাইল…………….. বেশ কয়েক বছর আগের কথা । চাঁদ তখন উনিশে পা রেখেছে । যাদবপুর ইউনিভার্সিটির সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ফার্ষ্ট ইয়ারের ছাত্রী………… সেদিন কি হল কে জানে……সকাল থেকে তার একটুও ইচ্ছা নেই কলেজে বেরোনোর, অথচ ড্রয়িং শীট সাবমিশন আছে সেকেন্ড হাফে ।বেশ একটা আলসেমী জড়িয়ে ধরেছে তাকে। গোটা রাতই প্রায় জাগা ড্রয়িং শীটের জন্য। সাঁতরাগাছি থেকে যাদবপুর যেতে দুটো বাস তখন পাল্টাতে হত। দুপুরবেলা চাঁদ খুব অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাসে উঠল।বাসের জানলায় মুখ রেখে দেখল রোদ্দুরে ভেসে যাওয়া আকাশটা কেমন যেন থমথম করছে। কোথা থেকে একফালি কালো মেঘ ঝড়ের আভাস দিচ্ছে……একটু পরে বাসটা ছাড়ল …..সঙ্গে দমকা হাওয়া, এলোমেলো বৃষ্টি….বৃষ্টির সাথে সাথে বাসের বন্ধ কাচের জানলায় ছোটো ছোটো শিলের টোকা পড়তে লাগল। চাঁদ ভাবল “ইস্ এখন কি হবে? ছাতাটাও নিই নি….বাস থেকে নেমে কোথায় দাঁড়াব? ভিজে যাব তো…..” ধীরে ধীরে বাস বিদ্যাসাগর সেতুর ওপর দিয়ে ,রবীন্দ্রসদন পেড়িয়ে ,বিড়লা প্ল্যানাটোরিয়ামের বিপরীতে এসে দাঁড়াল । চাঁদকে নামতেই হবে…..এখান থেকে সে যাদবপুরের বাস ধরবে…..ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্যে আরও কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে চাঁদও নেমে দাঁড়ালো একটা গাছের নীচে। দূরের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকল কখন বাস পাবে…..এমন সময় তার খেয়াল হল ‘কই , আমি ভিজছি নাতো?’ ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখল…..হ্যাঁ তা প্রায় ফুট ছয়েকের একটা ছেলে তার মাথার ওপর একটা ছাতা হেলিয়ে রেখে তাকে ভিজে যাওয়া থেকে অনেকটাই বাঁচিয়েছে….চোখে হাই পাওয়ারের চশমা , একমুখ খোঁচা খোঁচা দাড়ি,এলোমেলো চুল……এক গাল হেসে প্রশ্ন করল ” ফার্ষ্ট ইয়ার তো ? কোন ব্রাঞ্চ তোর ? ” চাঁদ একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল ” সিভিল “। মনে মনে ভাবল প্রথমেই তুইতোকারী করাটা একটু কেমন যেন লাগে ।পিছনে দাঁড়ানো ছেলেটা বলল ” আমি থার্ড ইয়ার মেকানিক্যাল…” এতক্ষণে চাঁদ বুঝে গেছে এই ছেলেটা তার আজকের সহযাত্রী….এতটুকুও কুন্ঠাবোধ না করে চাঁদ পাল্টা বলে উঠলো “আমি চন্দ্রিমা ব্যানার্জী…..তোর নাম কি? “আমি সোহম গাঙ্গুলী….তোর সিনিয়র….তুই বলাটা কি খুব জরুরি ?”চন্দ্রিমার মুখে একটা দুষ্টুমির হাসি …..বলল “অপরিচিত একটা মেয়েকে তুই যদি তুই বলতে পারিস , আমি কেন নয়?” দুজনের কথার মাঝখানে হুড়মুড় করে যাদবপুর মিনিবাস এসে দাঁড়ালো । সোহম ছাতাটা বন্ধ করে বাসের গায়ে দুটো চাপড মেরে বলল….” আস্তে লেডিস”….চাঁদ ওঠার পর সোহম বাসে উঠেই তার দুজন বন্ধুকে দেখে তাদের মাঝে গিয়ে বসলো….আর যেন চাঁদকে ভুলেই গেল । চাঁদ একদম লাস্ট সিটে গিয়ে বসলো….. অপলক দৃষ্টিতে সোহমের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ…..তারপর গোটা রাস্তায় আর একটাও কথা হয়নি দুজনের । চাঁদ কেবল জানলা দিয়ে বৃষ্টি দেখেছে আর ভেবেছে….সে যেন ভুলেও আর সোহমের ছাতার মুখাপেক্ষী না হয় । ধীরে ধীরে বাস গড়িয়াহাটের কাছে আসতেই বৃষ্টিটা থেমে যায় বেশ…..চাঁদ দেখে সোহম উঠে পড়েছে আর ওর দুই বন্ধু সৈকত আর দীপান্বিতাকে উদ্দেশ্য করে গলাটা বেশ তুলেই বল….কাজ আছে কয়েকটা….কম্পিউটার ক্লাসে দেখা হবে…..একদম বাসের দরজার মুখে গিয়ে চেঁচিয়ে বলে.”দীপু আমায় রাতে পারলে ফোন করিস একটা….নাম্বারটা মনে আছে তো…..03326608645….করিস কিন্তু….” দীপান্বিতা বলে,”নাম্বার বলার কি আছে? জানি তো ….করে নেব” চাঁদ একটু ফিরে চাইলেও সোহম পিছনে না দেখেই নেমে যায় বাস থেকে……চাঁদের চোখজোড়া কেমন যেন সোহমের চলার পথটা অনুসরণ করতে থাকে আর এমনই মুহুর্তে ফোন নাম্বারটা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে…… !!!!

 

………………………………………………………………………ক্রমশ

  
This entry is part 2 of 8 in the series চাঁদের পরিক্রমণ

 

পর্ব – ২/


 

 

মন খারাপ করা একটা দুপুরবেলা……জানলার বাইরের আকাশটা কালো মেঘে সেজে আছে…..চাঁদ হাতের সব কাজ সামলে ফোনটা নিয়ে খাটে এসে বসল ……একটা সময় ছিল, চাঁদের জীবনে ব্যস্ততা কিছু কম ছিল না….ইনফ্যাক্ট সারাটা দিনই প্রায় কেটে যেত অফিস ,সাইট আর বাড়ি করে ।খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলতে যারা ছিল আজকাল তাদের সাথেও আর যোগাযোগ হয়ে ওঠে না…..চাঁদ মোবাইলের কনট্যাক্টস দেখতে লাগল….কি আশ্চর্য , এমন কেউ নেই যাকে ফোন করে একটু নিজেকে ভুলিয়ে রাখা যায়…অথচ সে ছিল একটা সময়…তখন সারাদিন কথাই কথা….চাঁদ মিউজিক সিস্টেমটা অন করল….. এফ.এম এ গান বেজে উঠল ……”এমনি বরষা ছিল সেদিন /শিয়রে প্রদীপ ছিল মলিন / তব হাতে ছিল অলস বীন /মনে কি পড়ে প্রিয় “…..এই গানটা শুনতে শুনতে চাঁদ হারিয়ে গেল অতীতে…..হোয়াট আ কো-ইনসিডেন্স ….সেদিনও এই গানটাই বাজছিল……কতদিন আগের কথা ।দিনটা ছিলো একটা শনিবার …..এরকমই দুপুর বেলা চাঁদ কলেজ থেকে ফিরে নিজের ঘরে গান শুনছে …..ভীষণ চাপ যাচ্ছে কলেজে ….ড্রয়িং সাবমিশান চলছে….প্রায় এক সপ্তাহ হল…..চাঁদ নিজের শরীরটা বিছানায় এলিয়ে বালিশটা আঁকড়ে শুয়েছিল…..হঠাৎ কিছু একটা ভেবে উঠে বসল…..টেলিফোনটা সাইড টেবিল থেকে হাতের কাছে নিয়ে একটু ভাবল….. ‘কি যেন নম্বরটা?’……তারপর ডায়াল করল….অপর প্রান্তে রিং শোনা যাচ্ছে ….চাঁদ শ্বাস বন্ধ করে দুটো রিং শুনে লাইনটা কেটে দিল ।….কিন্তু চুপ করে বসে থাকতেও পারল না…ইতস্তত করে আবার ডায়াল করল…..অপর প্রান্তে একটা ভারী কন্ঠস্বর…’হ্যালো’ চাঁদ তড়িঘড়ি ফোনটা কেটে দিল….. একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে একটু শাসন করে , বিছানায় শুতে যাবে, …ফোনটা বেজে উঠল । চাঁদ ভাবল বুঝি বাবার ফোন….’মা তো নীচে থেকে ধরবেই’….কিন্তু ফোনটা দুটো রিং হয়ে কেটে গেল….চাঁদ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল….তার মন বলছিল এখনি আবার রিং হবে…..ভাবামাত্রই ফোনটা সত্যিই বেজে উঠল…..
চাঁদ: হ্যালো
কপটরাগে একটা পুরুষ কন্ঠ বলে উঠলো …’ফোন করে কথা না বলে কেটে দেওয়ার মানে কি ?’ যদিও চাঁদ বিশ্বাস করতে পারছিল না….তবুও রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল ‘কে বলছেন ‘? ফোনের ওপার থেকে অবিশ্বাস্য ভাবে সেই অপরিচিত কন্ঠস্বর বলে উঠলো ‘তুই চন্দ্রিমা তো ? ফোনটা তো আমাকেই করলি….তাও নামটা বলতে হবে? চাঁদের মনে তখন কেউ যেন হাঁপর টানছে……স্থবির অবস্থাটা একটু কাটিয়ে বিষ্ময়ের সুরে বললো ‘ সোহম….?….নম্বর পেলি কোথা থেকে?….
সোহম: তুই দিলি তো …(একটু হেসে বলল) চাঁদ: আমি?????….হেঁয়ালি করিস না….বল কে দিল নম্বর ?আর আমি ফোন করেছি তাই বা বললি কেন?
সোহম: আরে বাবা ,দম নিতে দিবি তো …..সেটাই তো কথা….কলার আই ডি ‘র কাজটাই তো এই ম্যাম ।
চাঁদ বেশ খানিকটা লজ্জা পেয়ে বলে….’আসলে বাসে সেদিন তোর এক বন্ধুকে নম্বর টা দিলি না….এতজোরে চিৎকার করে বলছিলি যে আমার কানেও পৌঁছেছিল…..আর আমার মেমারী এমনিতেই বেশ শার্প……’
কথাটা শেষ করার আগেই সোহম চপল স্বরে বললো …..’হুমমম…..আমি জানি তো …..তাই তো নম্বর টা তোকেই শুনিয়ে আবৃত্তি করলাম…..আর সেইদিন থেকেই ভাবছি ফোনটা কবে করবি……কলেজে দেখাও হচ্ছিলো না…..তোরা মেয়েরা ভাঙবি ,তবু মচকাবি না….. ।
এবার চাঁদ বেশ সপ্রতিভ হয়ে বলল’ এর মানেটা কি দাঁড়াল…..সেয়ানা গিরি!! ফোন নং চাইলে আমি কি দিতাম না?
সোহম: বলা যায় না….মুখের ওপর না বলে দিলে মানে লাগত….আফটার অল তোর সিনিয়র তো ।
চাঁদ : অত জুনিয়র সিনিয়র বুঝি না….চাইলে আমি ভাল বন্ধু হতে পারি….তবে ….?
সোহম: তবে কি?…..আচ্ছা ছাড়….তুই ক’টার বাসে এখান থেকে যাস….?
চাঁদ: কেন ? ন’টা কুড়ি….
সোহম: ঠিকই আছে ….সোমবার তাহলে সিটিসি বাসস্ট্যান্ডে ঐসময়ই দেখা হবে….ও.কে…বাই…রাখছি
চাঁদ : আচ্ছা …..বাই টাটা
চাঁদ যেন এতক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে ছিল……দরজায় কলিংবেলের আওয়াজে তার সম্বিত ফিরে এল………… ।
…………………………………………………………………………………………………ক্রমশ

  
PAGE TOP
HTML Snippets Powered By : XYZScripts.com
Copy Protected by Chetans WP-Copyprotect.