মনমাঝি-ঐন্দ্রিলা মুখোপাধ্যায় Monmajhi/oimookh.com
This entry is part 12 of 12 in the series মনমাঝি
Monmajhi/oimookh.com

মনমাঝি-ঐন্দ্রিলা মুখোপাধ্যায়  Monmajhi/oimookh.com

মনমাঝি / প্রচ্ছদশিল্পী: একতা ভট্টাচার্য

থৈ থৈ নদী জলে, সিঁড়ি কোনাকুনি
ভরা নদী কথা কয়, কান পেতে শুনি
নদী চরে এল নাও, বহু কাল পরে
মনমাঝি না ডাকিলে, কে বা পার করে?

কলকাতার মেয়ে শিমূল …..ঝাড়গ্রামে রাঙাপিসির বাড়িতে গিয়ে সেখানকার প্রকৃতিতে বিভোর হয়ে পড়ে।

ঝাড়গ্রামের রূপময় প্রকৃতির নেশাতুর হাতছানি তার মনের অতলে যে রং ধরিয়েছিল সেই কাহিনীর বিন্যাসই এই গল্পের শিরোনাম ….

 

প্রকৃতির বুকে এ এক অন্যধারার প্রেমজ উপাখ্যান।

মনমাঝি
ঐন্দ্রিলা মুখোপাধ্যায়

প্রকাশক: দ্য কাফে টেবল
প্রচ্ছদশিল্পী: একতা ভট্টাচার্য

সম্ভাব্য প্রকাশকাল: জানুয়ারি ২০১৯।

  
মনমাঝি-ঐন্দ্রিলা মুখোপাধ্যায় Monmajhi/oimookh.com
This entry is part 11 of 12 in the series মনমাঝি

‘ঐ মুখ’ ( oimookh.com ) নামের আড়ালে আমি লেখালিখির সাথে যুক্ত প্রায় পনেরো বছর। কিন্তু তা যে কোনদিন বই আকারে দুমলাটের মাঝে বেরোবে এ স্বপ্ন আমি জেগে কেন, ঘুমিয়েও দেখিনি। প্রতিটি লেখা তো লেখকের কাছে সন্তানতুল্য, তাই তাদের সঠিক পরিচয়দানের আবশ্যিকতা নিশ্চয় আছে , –এই বিষয়ে সর্বপ্রথম যিনি আমাকে ভাবিয়েছেন তিনি আর কেউ নন , পরম মিত্র The Cafe Table এর অন্যতম কর্ণধার Avishek Aich। তাই তাঁর প্রতি আমার অন্তহীন শ্রদ্ধা রইল । সাথে সাথে অনিঃশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই ‘দ্য কাফে টেবিলে’র আরো এক কর্ণধার অরিজিৎ ভদ্র ও প্রচ্ছদ শিল্পী Ekta Bhattacharjee কেও। সবশেষে এইটুকুই বলি আমার অনেক লেখার মধ্যে থেকে যে কাহিনী বিন্যাসটি “মনমাঝি” শিরোনামে প্রকাশিত হতে চলেছে , তার তাগিদ , এক অন্য কাহিনী যার শিরোনাম জীবন।

*************************************************************************************

Monmajhi/oimookh.com

মনমাঝি-ঐন্দ্রিলা মুখোপাধ্যায় Monmajhi/oimookh.com

প্রকৃতি আর প্রেম চিরকাল আবিষ্ট করে রাখে আমাদের জীবন, আমাদের যাপন। মনের অন্ত্যমিলে নিরন্তর জারি থাকে সমকালীন এক খোঁজ!

কলকাতার মেয়ে শিমুল এক বসন্তের সকালে পা রেখেছিল অরন্যসুন্দরী ঝাড়গ্রামে রাঙাপিসির বাড়িতে। সেখানকার মোহময়ী প্রকৃতির ছোঁয়ায়, ষোড়শী শিমুলের শরীরে মনে ছড়িয়ে পড়েছিল ফাগুনের আগুন। সত্যি বলতে ঝাড়গ্রাম তাকে প্রেম দিয়েছিল যেমন অকাতরে, তেমনি তার সেই ভালোবাসার নেশায় মাখিয়ে দিয়েছিল একরাশ বিষাদ। একসময় জীবন বাঁক নিয়েছিল নতুন খাতে। সেদিনের সেই কিশোরী শিমুল ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল বাসন্তীর এক গ্রামীণ স্কুলের শিক্ষিকা। যার অনুভবে শুধুই নেশাতুর সবুজের হাতছানি আর গ্রামের পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য কিছু করতে চাওয়ার বাসনা। সেই ইচ্ছেটুকুকে সম্বল করে গড়ে তুলেছিল এক সংগঠন। যা ছিল তার জীবনে হাজার বন্ধকের মাঝে মুক্তি। কিন্তু হঠাৎ কোন সে অভিমান তাকে তার এমন সহজিয়া জীবন ছেড়ে নিয়ে যেতে চাইল বিদেশের ঝাঁ চকচকে শহুরে কেতার জীবনে? যে শিমূল জঙ্গল ভালোবাসে, নদী ভালোবাসে,মেঠো সুর ভালোবাসে,সে কেন বাধা পড়তে চাইছে আপোষের জীবনে। সেকি বিদেশের প্রতি আকর্ষণ নাকি স্বেচ্ছা নির্বাসন? ঝাড়গ্রামের পলাশের গৈরিক রঙ -এর মাঝে সে কি খুঁজেছিল, ভালোবাসার আগুন নাকি বৈরাগ্যের ছোঁয়া?? শিমুল, তার ভালোলাগা-অপেক্ষা-স্বপ্ন আর তার আপোষ-অভিমান-লড়াই, মূলত তার ভালোবাসার একাল আর সেকাল, তার জীবন নদীর দুইপাড়ের টানাপোড়েনে তার মন রূপ মাঝি বেছে নেবে কোন সে পথ? যা সমকালীন হয়েও চিরকালীন??

প্রকৃতির বুকে এ এক অন্যধারার প্রেমজ উপাখ্যান

মনমাঝি
ঐন্দ্রিলা মুখোপাধ্যায়

প্রকাশক: দ্য কাফে টেবল
প্রচ্ছদশিল্পী: একতা ভট্টাচার্য

সম্ভাব্য প্রকাশকাল: জানুয়ারি ২০১৯।

ঈশ্বরজন্ম

———————————–

আমার মাঝে শ্রাবস্তীর কারুকার্য

খুঁজতে চেয়েছিলে কিনা

আমার সঠিক জানা নেই,

তবু তোমার মনের খননকার্য

আজও জারি আছে জেনে সত্যি ভালো লাগে,

ভালো লাগে যখন

জীবনের সমস্ত ভুলগুলো সরিয়ে রেখে

তুমি একটিবারও আক্ষেপ না করে,

নতুন ভাবে আমাকে ভালোবাসতে চাও।

সারা জগত সংসারকে একদিকে ফেলে-

তুমি তার উল্টো মুখে বসে থাকো

তোমার স্বপ্নের পসরা নিয়ে।

দুদিকে উদ্যত ভাঙন-

আর তুমি তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে

আমার ঠোঁট ছুঁয়ে

সৃষ্টির সাধনায় মাতো!

তোমাকে দেখতে দেখতে মনে হয়,

ভালোবাসা মানুষকে

পৌঁছে দিতে পারে এমন উচ্চতায়,

যাকে দেখতে জীবনে অন্তত একবার

ঈশ্বরজন্ম নিতেই হবে।

যেখানে সারা আকাশ জুড়ে থাকবে অরোরা বোরিয়ালিস!

আর পৃথিবীর তিনভাগ জলে প্রতিফলিত হবে,

তার সেই উজ্জ্বল সবুজ আভা!

যার সামনে হাত বাড়িয়ে তুমি মেটাবে

তোমার আজন্মের ক্ষিদে-

আর আমি বলব,

আমাকে এমন করেই তুমি

যুগে যুগে ভালোবেসো সাধক।
—@ oimookh.com

  

রাশিচক্র
———————-

শুধু এইটুকু ভাবতেই বেশ লাগে জানিস,
আমারও একজন ‘তুই’ আছে,
আমার রাশিচক্র বলে,
আমি নাকি দমকা হাওয়া
কিন্তু আমি জানি,
আমার আকড় জলে জলময়।
কারণ যারা স্বপ্ন দেখে, আর যারা স্বপ্ন দেখায়
এদের দুজনের মাঝে যে প্রেম থাকে
সেই প্রেমে আকন্ঠ ডুবে থাকার যে নেশা থাকে
তাতেই তো একটা গোটা ব্যারেন ল্যান্ড
ফুলে ফলে ভরে উঠতে পারে।
তাই তোর কাছে আমার বলতে দ্বিধা নেই,
তুই আমার কাছে যেভাবেই থাক
সমকালীন বা চিরকালীন –
তুই থাকলে প্রেম আসে
যে প্রেমে বৃষ্টি আসে, জল বাড়ে।
জল বাড়লেই বান আসে-
আর জানিসই তো,
চিরকালই আমার গোত্র বানভাসি!
লগ্ন তুঙ্গ , নক্ষত্র গোলমেলে!
তাই দোহাই তোর,
নতুন করে আমার কুণ্ডলী বিচার করতে যাস না।
আমি যেমন ছিলাম, তেমনই আছি,
আর থাকবও তেমন।
শুধু প্রেম আর অপ্রেমের মাঝের জানলাটাকে বন্ধ রাখিস।
দশা অন্তর্দশার মাঝে থেকে প্রতিপক্ষের চাঁদকে
নিরন্তর কৃষ্ণপক্ষ আর শুক্লপক্ষের মাঝে হারিয়ে যেতে দিস না।
দেখবি তোর উঠোনেও একদিন জমে উঠবে –
বাড়বাড়ন্ত জোছনার জল।
সে আমি থাকি আর নাই বা থাকি।
———————— @ www.oimookh.com

  
This entry is part 6 of 6 in the series বল মন 'সুখ' বল

This content is password protected. To view it please enter your password below:

  
This entry is part 5 of 6 in the series বল মন 'সুখ' বল

This content is password protected. To view it please enter your password below:

  
This entry is part 4 of 6 in the series বল মন 'সুখ' বল

পর্ব – ৪।

অফিসের পরিবেশটা আজ একটু হালকা হালকাই…তবুও নিউ প্রোজেক্টের এস্টিমেটটা দেখা বাকি আছে , বেলেঘাটার সাইটের ওয়ার্কিং ড্রয়িং-এর কপি, ইন্সপেকশন রিপোর্ট , ক্লায়েন্টের সাথে মিটিং সামলে লাঞ্চে গৌরদাকে দিয়ে কিছু ক্যাথলিন কেক আর চিকেন স্যান্ডুইচ আনতে দিল মিথিল সবার জন্য। তারপর কফি , কেক , স্যান্ডউইচ খেয়ে জে .কে. কন্সট্রাকশনের অফিসে বেরিয়ে গেল । যাবার আগে মিথিল কতকগুলো অ্যামোনিয়া প্রিন্ট রেডি করতে দিয়ে গেল তার পি. এ. বিপুলকে । কাল ছুটি , তাই আজই কাজটা করে রাখতে হবে । বিপুল গৌরদাকে সব বুঝিয়ে দিল।
…গৌরদা সেই প্রিন্টগুলো রেডি করে নিয়ে রিশেপ্সনে এসে দাঁড়াতেই , চোখে পড়ল কঙ্কনাকে। কঙ্কনা আগেও যেহেতু এসেছে এই অফিসে তাই গৌরদা ভালোই চিনত তাকে … বলল ‘কি ম্যাডাম , কেমন আছেন?’
- আরে গৌরদা যে, সব ভালো তো ? অফিস কেমন চলছে ?
– আমি ভালো আছি আর অফিসও ভালো চলছে , তবে আপনার কি আজ আসার কথা ছিল।
- হ্যাঁ । মিথিলদা আছেন ?
- না বেরিয়েছেন …একটু অপেক্ষা করুন এসে যাবেন।
-ঠিক আছে , আমি বসছি ভিসিটিং-এ।
… বসে থাকতে থাকতে কত পুরোনো কথা কঙ্কার মনে পড়ছিল। সত্যি বলতে তার সারাদিনে বহুবার বহুকাজের মধ্যে এমনি মনে পড়ে যায় পুরোনো সেইদিনগুলো , মনে পড়ে যায় মিথিলকে। ইচ্ছে করে মিথিলকে দেখতে। ফোনে কথা শুনতে। রাতে ঘুমের ঘোরে মিথিলকে স্বপ্ন দেখে চোখের পাতা জলে ভারী হয়ে যায় কঙ্কার। স্মৃতি তো সততই সুখের ,তাই কখনও কখনও নিজের মনেই পুরোনো কথায় হেসে ওঠে কঙ্কা , কিন্তু তারপর বাস্তবের একাকিত্বে বড়ো ফাঁকা ফাঁকা লাগে, মনটা কেমন যেন অসাঢ় হয়ে থাকে , কোনও কিছুতেই সায় দেয় না…… তার ওপর মাঝ রাতে বাসবের জোড়াজোড়িতে তার দম বন্ধ হয়ে আসে , ইচ্ছে করে মিথিলের কাছে ছুটে যায় কিন্তু…
…ভাবতে ভাবতে প্রায় পৌনে সাতটা বেজে যায়। হঠাৎ কাচের দরজা ঠেলে ঝড়ের গতিতে অফিসে ফিরে আসে মিথিল। কঙ্কাকে চোখে পড়তে হাঁটার গতি একটুও শ্লথ না করে চোখের ইশারায় কঙ্কাকে ভেতরে আসতে বলে। নিজের কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে চলে যায় মিথিল । এক মুহুর্তের জন্য কেমন একটা জড়তায় কঙ্কা যেন স্থির হয়ে যায়… মিথিলের আসাটা এক ঝলক মনে পড়তেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মিথিলের গলায় তার দেওয়া মাফলারটা। মনে মনে ভিজে যায় কঙ্কা। কিন্তু নাহ, তার তো দুর্বল হলে চলবে না …। সত্যি তো এইরকম সম্পর্কের কোনও পরিণতিই হয় না , তো কি লাভ আছে দুটো মানুষের মিথ্যে চাওয়ায় দুটো পরিবারকে সংকটের মুখে ফেলার!… তার চেয়ে এই ভালো…যে যার নিজের বৃত্তেই আবদ্ধ থাক। একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে কঙ্কা এগিয়ে গেল কেবিনের দিকে, তারপর দরজা খুলে ভিতরে গেল। কেবিনের দরজায় কঙ্কাকে দেখে মিথিল শান্ত স্বরে বলল ,
-ভেতরে এস কঙ্কা।
…তারপর বেল দিয়ে গৌরদাকে ডেকে দুকাপ কফি দিতে বলল মিথিল। কঙ্কা বসল মিথিলের একেবারে সোজাসুজি। মিথিল চোখ থকে চশমা খুলে এক গ্লাস জল খেয়ে মাথার পিছনে হাত রেখে চেয়ারটা একটু হেলিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখল কঙ্কাকে। আগের চেয়ে কঙ্কা যেন একটু ম্লান , একটু স্থুল , একটু আটপৌরে । কঙ্কাও অবশ্য এতক্ষন নীরবে তাকিয়েছিল মিথিলের দিকে, আর মনে মনে মেলাচ্ছিল মিথিলকে, নাহ্‌ কোনও পরিবর্তন হয়নি মিথিলের শুধু মাথার চুলে ঈষৎ পাক ধরেছে আর চশমার ফ্রেমটা চেঞ্জ হয়েছে । কঙ্কাকে চুপ থাকতে দেখে মিথিল নিজে থেকেই বলে ,

- কি ভালো আছো তো?
- হুম আমি ঠিক আছি । তুমি?
… একটু অর্থপূর্ণ হাসল মিথিল। … মনে মনে বলল ‘আজও কি আমায় ভাবো কঙ্কা?’
কঙ্কাও যেন মনে মনে উত্তর করল ‘ ভাবি গো ভাবি আজও তোমার কথা ভাবি আমি। কিন্তু আমার হাত পা যে বাঁধা মিথিলদা এটুকু কি তুমি বোঝো!’
কফি এল… কঙ্কা একটু চুপ থেকে ,বলল
-আমার ওপর খুব বিরক্ত হয়েছ তাই না?
-নাহ!
-সত্যি বলছ?
- জানি না…মানে ভাবি নি। কি বলবে বলছিলে?
একটু সময় নিল কঙ্কা। আনত মুখ , টেবিলের কাচে নখ দিয়ে আঁচড় কাটা, দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ানো , বুকের কাছে আঁচলের আড়ালে শ্বাস-প্রশ্বাসের ওঠাপড়া … কঙ্কার এই স্বভাবগুলো মিথিলের খুব চেনা। তার খুব ইচ্ছে করছিল সবার অলক্ষ্যে কঙ্কাকে জড়িয়ে একটা দীর্ঘ চুমু দিতে। কিন্তু সব ইচ্ছে কি সব সময় পূরণ হয়! মিথিলের ঠোঁটটা শুকিয়ে আসছিল, নাহ্‌ একটা সিগারেট ধরাতে হবে। মাথার চুলগুলো হাতে করে ঝাঁকিয়ে আপাত গম্ভীর স্বরে বলল,
-আমি আজ একটু তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে যাব কঙ্কা। কি বলবে বল।
মিথিলের এই আপাত রাগটাও আবার কঙ্কা খুব ভালো চেনে। সে জানে এমন রাগের সময় মিথিলের খুব কাছে গিয়ে মিথিলের হাত দুটো ধরলেই তাকে উস্কে দেওয়া যায়। কিন্তু দুজনে দুজনকে এত ভালোভাবে জানার পরও কে যেন এক অদৃশ্য পাঁচিল তুলে দিয়েছে তাদের মাঝে…তাদের মাঝের সেতু আর খেয়া দুইই গেছে আজ হারিয়ে , এখন দুজন যেন নদীর দুই কুলে দাঁড়িয়ে একে অপরের দিকে দীর্ঘ শ্বাস টুকুই ছুঁড়ে দিতে পারে। অবশেষে মিথিলের দিকে সোজাসুজি চোখ রেখে কঙ্কা বলল,
- যাক, তবে কাজের কথায় আসি… মিথিলদা বাসব জে .কে.কন্সট্রাকশনের টেন্ডার কোট করেছে। ফাইনাল লিস্টিং-এর আগে তুমি যদি একটু সুপারিশ করতে, তাহলে বাসব কাজটা পেতে পারে । ওকে একটা সুযোগ করে দেবে , কাজটা পেলে ওর একটা হিল্লে হয়ে যেত। বেশ কয়েক বছর ধরে ওর ব্যাবসাটা মার খাচ্ছে ।
মিথিল যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তবুও ঘোরটা কাটিয়ে বলল,
- তুমি কি এইজন্যই আমার সাথে দেখা করতে এসছিলে? আমি তো ভাবলাম তোমার আমাকে আরো কিছু বলার আছে।
কঙ্কা চুপ করে গেল , তারপর বলল,
- নিজেদের কত রকম সুবিধে অসুবিধের কথা আগে আমরা দুজনে দুজনকে বলেছি তো মিথিলদা , আজ কি আমি এতটাই পর হয়ে গেছি যে …
কথাটা শেষ করতে পারল না কঙ্কা …গলাটা কান্নায় বুজে এল।
-এটা তুমি বলছ কঙ্কা? আমি তো সরে আসতে চাইনি তোমার কাছ থেকে? তুমি সরিয়ে দিয়েছ নিজের ঔদ্ধত্যে । দিনের পর দিন তোমাকে ফোন করেছি, মেসেজ পাঠিয়েছি, তুমি কোনো জবাব দাও নি। এরপরও তোমার মনে হয় আমি তোমার জন্য এসব করব ? কেন করব ? কি পাব আমি? একটা সময় তোমাকে আমি ধরে রাখতে চেয়েছিলাম এটা সত্যি কিন্তু আজ আমার কোনো আগ্রহই নেই তোমার ব্যাপারে । তাহলে কেন করতে যাব আমি এসব?
-আমি জানি মিথিলদা, চাইলে তুমি করতে পারো । কিন্তু করবে কেন? ইটস্‌ আ মিলিয়ন ডলার কোয়েশ্চেন! আসলে জানো সম্পর্কটা যে জায়গায় থেমে গেছে এর চেয়ে আর এগোনোর ছিল না বলেই বোধহয় সুতোটা কেটে গেছিল। কিন্তু আমি সত্যি ভাবিনি তুমি আজ এতো হিসেব কষবে ।আজ বুঝছি জীবনে তো কত ভুলি করেছি এটাও একরকমের ভুলই । এর চেয়ে ভালো ছিল তুমি যদি বলতে এই কাজটার বিনিময়ে তুমি আমাকে আগের মতই কাছে ধরে রাখতে চাও। তবু বুঝতাম আজও আমার প্রতি তোমার কিছু ভালোলাগা আছে। কিন্তু আজ তো তোমার কোনো চাওয়াই নেই আমার কাছে …তাই কেনই বা ভাববে তুমি আমার কথা? ঠিক বলেছ তুমি …..একেবারে ঠিক!!!
মিনিট খানেক চুপ করে থেকে কঙ্কা সিট ছেড়ে উঠে পড়ল । তারপর নিঃশব্দে এগিয়ে গেল সামনের দিকে ।পিছনে ফিরে মিথিলকে দেখার ইচ্ছেটা শেষবারের মত সংবরণ করল।

_____________________________________ক্রমশ

  
This entry is part 3 of 6 in the series বল মন 'সুখ' বল

পর্ব – ৩।

…সারা কলকাতা শহরটাই কদিন ধরে কেমন যেন উৎসবের আমেজে মেতে আছে। সেই বড়দিনের সময় থেকেই রাস্তা ঘাটে দোকানে বাজারে আলোর রোশনাই …তার সাথে যোগ হয়েছে ল্যান্টারন্‌স , বেল্‌স , স্ট্রীমার্‌স,স্টার্‌স… আরো কত কি? গাড়ি নিয়ে বালিগঞ্জ থেকে পার্ক স্ট্রিট আসতে আসতে পুরোনো কথাগুলো আবার মিথিলকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেতে লাগল। সত্যি বলতে মিথিল কিন্তু কঙ্কাকে কম ভালোবাসে নি । তবে মিথিল আর কঙ্কার সম্পর্কটা কোনও পূর্ব নির্ধারিত বা সুপরিকল্পিত সম্পর্ক ছিল না… এটা একটা দুর্ঘটনা কিম্বা বলা ভালো ভাগ্যের খেলা। বন্ধুমহলে যদিও মিথিল আর সৃঞ্জা ভীষণ আইডিয়াল কাপ্‌লই ছিল, তবুও যেন সৃঞ্জার বাবা মায়ের সমস্ত বিষয়ে মতামত জ্ঞাপন আর সৃঞ্জার মন-মর্জীর তোয়াক্কা করতে করতে মন থেকে কেমন যন্ত্র হয়ে উঠছিল মিথিল…একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হচ্ছিল তার মনের মধ্যে দিনে দিনে …যার কারনটা মিথিল চেষ্টা করেও ঠিক খুঁজে পায় না। এমনি এক সময় মিথিলের নতুন অফিসের ট্যাক্স কনসালটেন্ট বরুন মিত্রের কাছ থেকে অডিটর হয়ে মিথিলের অফিসে আসে কঙ্কনা সিন্‌হা। তার দায়িত্ববোধ, ধৈর্য , যত্ন ও রুচিশীল ব্যবহারে ধীরে ধীরে একটু একটু করে মিথিলের মনের ফাঁকটা তার অজান্তেই কেমনভাবে যেন ভরে উঠছিল। সেই ভালোলাগার পরিভাষাটা দিনে দিনে বদলাতে লাগল কঙ্কানার জীবনে বাসবের দুর্বিষহ অত্যাচারের কারনে। বাসবের কন্ট্রাক্টরী ব্যবসার ঘাটা আর মাঝে মাঝে সাইকোপ্যাথের মত ভয়াবহ আচরণ দিনে দিনে কঙ্কনাকেও যেন মিথিলের দিকে এগিয়ে আনছিল…যার সর্বশেষ পরিনতি হল… কঙ্কনা ধীরে ধীরে মিথিলের কাছে কঙ্কা হয়ে উঠল আর দুজনের মাঝের অফিসিয়াল রিলেশনটা মুখ মুখোশের আড়ালে আনফিসিয়ালি মন ছেড়ে শরীরে এসে দানা বাঁধল। আর মানুষের মন তো পদ্ম পাতায় জল… যে সময় একটু একটু করে মিথিলের মন সৃঞ্জার থেকে কঙ্কার দিকে সরে যাচ্ছিল, সেই সময় মিথিল নিজের মনের সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে একটাই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেরাচ্ছিল …একসাথে কি দুজনকে ভালোবাসা যায় না ??? কঙ্কার কারণে সে তো আর সৃঞ্জাকে অবহেলা করছে না ! কই তার তো আগের মত নিজেকে আর ফাঁকা লাগে না, বেশ তো সৃঞ্জা আর কঙ্কাতে মনটা ভরেই রয়েছে তার …। কাজে কত মনযোগ দিতে পারছে ! তাছাড়া কঙ্কা অত ডিমান্ডিং ছিল না, আর সেও মিথিলের মধ্যে একটা পরম নিশ্চিন্ত আশ্রয় পেয়েছিল। ফলত দুজনার সম্পর্কের মাঝে খেয়া আর সেতু দুটোই গড়ে উঠেছিল ভাগ্যের নিপুণ চালে।মিথিলের মনে হয়েছিল, যে সম্পর্ক একে অন্যকে সমৃদ্ধ করছে সে সম্পর্ক খারাপ কেন হবে ? সৃঞ্জা যেমন তার নিজের স্পেস খুঁজে নিয়েছে তার বাবা মা ভাই বোন বন্ধু বান্ধবের মাঝে, ঠিক তেমনই মিথিলও স্পেস খুঁজেছে কঙ্কার মাঝে। এর মাঝে দোষের কি আছে? শুধু বিবেকের দংশন বলতে একটু সত্যগোপন অর্থাৎ লুকোচুরি…এটুকু মানিয়ে নিতেই হয়। … সত্যিই তো সারাজীবনে সব কথা কি সবাইকে বলার ? বলা যায় নাকি বলাটা উচিৎ। আর তাছাড়া সত্যগোপন আর মিথ্যাচার তো এক নয়?… এইভাবে বেশ কাটছিল দুজনের , দুজনের মাঝে এত সুন্দর বোঝাপড়ায় কোনো সমস্যাও ছিল না। আর মিথিল দিব্যি শ্যাম কূল বজায় রেখে জীবনটা উপভোগ করছিল। কিন্তু কোথা থেকে কি যে হল তাদের পাক্কা দু বছরের মধুর সম্পর্কটা কেমন যেন পান্‌সে হয়ে উঠতে লাগলো । ধীরে ধীরে কঙ্কা যেন কেমন বদলে যেতে লাগলো । যে ব্যালান্সটা মিথিল পাক্কা খেলোয়ারের মত করতে সক্ষম হচ্ছিল…কঙ্কা কিন্তু সত্যিই পারছিল না। তার পরিবারে মিথিলকে নিয়ে যতটা জল ঘোলা হয়েছিল তার থেকেও বেশি সে আত্মদহনে পুড়ছিল । মিথিলকে বোঝানোর চেষ্টা করলেও, মিথিল কিছুতেই বুঝতে চাইছিল না । আর খুব সত্যি বলতে ,জোর করে আর যাই হোক ভালোবাসা হয় না। তাই মিথিলের চাপাচাপিতে কঙ্কা ধীরে ধীরে শরীরে মনে স্থবির হয়ে যাচ্ছিল। এক অদ্ভুত মানসিক যন্ত্রনা হাত থেকে মুক্তি পেতে সে এড়িয়ে চলতে চাইছিল মিথিলকে। কিন্তু সে কথা মিথিলের উপলব্ধির বাইরে ছিল বোধহয় ।

……দিনের পর দিন বিভিন্ন অছিলায় কঙ্কা সরে থাকতে থাকতে শেষ পর্যন্ত একদিন মিথিলের সাথে টানাপড়েনটায় ইতি টেনেই দিয়েছিল। মিথিলের আজও বেশ মনে আছে কঙ্কার সাথে তার শেষ কথোপকথনটা । কঙ্কার মুখে তখন কেবলি একটাই কথা…
– মিথিলদা , আমার ভীষণ ক্লান্ত লাগছে ।
-কিসের ক্লান্তি কঙ্কা?
– একদিকে তুমি আর অন্যদিকে বাসব …আমি যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছি। আমি অভিনয় করতে করতে হাঁফিয়ে উঠছি মিথিলদা …কোনটা আসল আর কোনটা অভিনয় আমার গুলিয়ে যাচ্ছে।
-অভিনয় বলছ কেন?
– অভিনয় নয়? বাসবের সাথে কি আমি মিথ্যে ভালোবাসার অভিনয় করছি না? আমি কি মেশিন মিথিলদা?
-আমি বুঝতে পারছি না তোমার অসুবিধেটা কোথায় হচ্ছে কঙ্কা ? আমরা সারাদিনে তো কাজের মাঝেও নিজেদের মধ্যে একটা কোয়ালিটি টাইম কাটাই কঙ্কা, তারপরও তুমি বলছ!!! আমি সারাদিন যতটা অ্যাটাচ্‌ড তোমার সাথে থাকি ফোনে , এস.এম.এস-এ ততটা আমি আমার ফ্যামিলিকেও সময় দিই না। …তুমি চাইলে আমি তোমাকে সময় দিই তো?
-কিন্তু মিথিলদা শুধু কি এইটুকুতেই শান্তি ? আমার তো একটা মন আছে বল । যখন তোমাকে কাছে পেতে ইচ্ছে করে বাসব এসে আমার অঙ্গরাজ্যের অধিকর্তা হয়ে বসে, বাসবের ছোঁয়া আর তোমার ছোঁয়া কি এক ?? তোমাকে চিন্তা করে যদি বা বাসবকে মেনেও নিয়ে বিছানায়, তবু অদ্ভুত একটা বৈসাদৃশ্য আমাকে ভীষণভাবে অতৃপ্ত করে তোলে…তখন আমার নিজের ওপরই রাগ হয়, ঘৃণা হয় … বিশ্বাস করো , কান্না পায় , একা লাগে…পাগল পাগল লাগে। মনে হয় আমি কি সাঙ্ঘাতিক ভুল করেছি তোমার সাথে নিজেকে জড়িয়ে। এভাবে আমি নিজেই নিজের কাছে ছোট হয়ে যাচ্ছি মিথিলদা । মনে প্রানে শরীরে ভালোবাসব তোমাকে আর বাসব তার স্বামীত্বের অধিকারে সহবাস করতে বাধ্য করবে আমাকে ওর সাথে। আমি এটা আর মানতে পারছি না ।
-দুররর, তুমি বড় বেশি ভাব কঙ্কা। এগুলোকে এত প্রশ্রয় দিতে নেই।
-না মিথিলদা না…আমার মনে হচ্ছে আমিও বোধহয় সাইকো হয়ে যাচ্ছি দিনে দিনে, প্রতারণা করছি সব চাইতে বেশি আমার সন্তানের সাথে। বুবুনের কি দোষ বলো ? ওকি পাচ্ছে ওর মাকে পুরোপুরি ? আমি কি নিজের সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত থেকে ওকে অবহেলা করছি না? আমি কি পারছি ওকে একটা সুস্থ জীবন দিতে?
-কিন্তু তুমিই তো বলতে কঙ্কা বাসবের সাথে তোমার কোনোভাবেই মিলমিশ হয় না, ওর একগুয়েমি , অল্পশিক্ষা, প্রকারন্তরে অমানবিক আচরণ তোমাদের মাঝে দিনে দিনে একটা অদৃশ্য পাঁচিল তৈরি করে দিয়েছে! যে বাসবের হাত ধরে তুমি একদিন বাড়ি ছেড়েছিলে সেই বাসবকে আজ তোমার অচেনা লাগে , আর তুমি সেই বাসবকে আঁকড়ে ধরেই বা বাঁচবে কি করে? তুমি ওর থেকে সরে এসে স্বাধীনভাবে বাঁচো কঙ্কা । আমি যতটা পারব তোমাকে সাহায্য করব। আমি বলছি তুমি ভালো থাকবে।
-কিন্তু বুবুনের তো মা বাবা দুজনকেই চাই বলো…ওর তো আমাদের দুজনের হাত ধরেই বেড়ে ওঠার কথা। আর সত্যি বলো এতদিন ছিলাম তো এই অমিল নিয়েই ? তখন পারলাম কি করে? আসলে কি জানো মিথিলদা, মানুষষের কাছে বেশি অপশন থাকা উচিত নয়? তাহলেই মনের মাঝে না পাওয়াগুলো বড় বেশি খোঁচা মারে । মনে অস্থিরতা আসে , স্বার্থপরের মত নিজের ভালোটুকুই বুঝতে চায়… সত্যি বলতে তোমার সাথে সৃঞ্জার সম্পর্ক এতটা তিক্ত নয় তো , তাই তুমি আমার জ্বালাটা বুঝতে পারছো না। না , মিথিলদা , না…আমি অনেক ভেবেছি…আমি আর পারছি না…আমায় তুমি ক্ষমা কর … আমায় তুমি মুক্তি দাও!!!
ভাবনার সুতোটা তখনও ঠিকমতো কাটে নি …হঠাৎই ড্রাইভার ইকবাল গাড়িতে প্রচন্ড জোর ব্রেক কষলো । গাড়িটা থেমে গেল অফিসের একটু আগেই…ইকবাল চিৎকার করে উঠল,
-ওই শালা , শুয়ার কে পিল্লা , মরনা চাহতা হ্যায় ক্যায়া?
-কি হল ইকবাল ? গালি দিচ্ছ কেন?
-আরে সাব , আভি আভি চাক্কে কে নিচে চলা যাতা …শালা ভিখ মাঙ্গনেবালা!
… কাচের জানলার ভিতর দিয়ে মিথিল দেখল একটা বাচ্ছা ভিখারী ছেলে, যার কোমর থেকে বাকি শরীরটা একেবারেই অকেজ , দুটো হাত দিয়ে টেনে টেনে হেঁটে রাস্তাটা পেরিয়ে ফুটপাথে গিয়ে উঠল। রাস্তা পার হতে গিয়ে মিথিলে গাড়ির নীচে চলে যেত, আরেকটু হলেই। ছেলেটাকে অফিসের পাশে বেশ কয়েবার বসে থাকতে দেখেছে মিথিল আগে । মাঝে সাঝে জুলজুল করে চেয়ে থাকতে দেখে মিথিল পাঁচ দশটাকা দিয়েছেও …আজ গাড়ি থেকে মিথিল দেখল, এই প্রচন্ড ঠান্ডায় একট ছেঁড়া সোয়েটার পরে ন্যাড়া মাথায় ফুটপাথের এক পাশে মাথা নামিয়ে ইকবালের গালি খাচ্ছে। ইকবাল বলে যাচ্ছে,
– আবে বুরবক ইসতারা কই রাস্তা ক্রশ করতা হ্যায় ক্যায়া?
মিথিল বলল,
– গালি মাত দো , ছোড় দো ইকবাল, দের হো রাহা হ্যায় … গাড়ি পার্ক করনেকা জরুরত নেহি হ্যায়, মুঝে উতার জানে দো …অর তুম থোরাসা আগে যাকে গাড়ি ঘুমাকে , ঘর চলা যাও …মেমসাবকো বাহার যানা হ্যায় ।
…মিথিল গাড়ি থেকে নেমে ছেলেটার দিকে যেতে গিয়ে… একবার ঘড়িটা দেখল, তারপর আর সেদিকে না গিয়ে সোজা অফিসের দিকে হাঁটা লাগালো।
_______________________________________ক্রমশ

  
This entry is part 2 of 6 in the series বল মন 'সুখ' বল

পর্ব – ২।

আজ বছরের শেষ দিন। কাল নতুন বছরে মামমামের জন্য গিফট কিনতে হবে কিছু মিথিলকে । আজ অফিসে জে.কে.কন্সট্রাকশনের সাথে ভাইটাল মিটিং আছে তার । টেন্ডার কোট নিয়ে ফাইনাল আলোচনা। রাতে আবার থার্টি ফার্স্ট ইভের জন্য সৃঞ্জার বন্ধু আর তাদের হাব্বিদের নিয়ে লেট নাইট পার্টি… তার মধ্যে কঙ্কার ফোনটা এসে যেন সব গুলিয়ে দিল মিথিলের আজকের প্ল্যানিংটাকে। সত্যি মেয়েরা অনেকটা পারে । অথচ একটা সময়ে এই কঙ্কাই তাকে দিনের পর দিন এড়িয়ে চলেছে , বহু চেষ্টা করেও সে নাগাল পায় নি কঙ্কার… অনেক বুঝিয়েও তাদের মাঝের পোড়ে পাওয়া সম্পর্কের রেশটুকুকে রক্ষা করতে পারে নি সে…শেষ পর্যন্ত কঙ্কার সাথে স্বপ্নিল সম্পর্কটার ইতি টানতে বাধ্য হয়েছিল মিথিল । তার খুব খুব অসুবিধে হয়েছিল কঙ্কাকে মন থেকে সরিয়ে রাখতে। কঙ্কার সাথে কাটানো সময়গুলো তাকে মাঝে মাঝে ভীষণ অস্থির করে তুলত। এমনকি সৃঞ্জার সাথে অতি ঘনিষ্ঠ মুহুর্তেও তার কেবলি কঙ্কার ছোঁয়াটা মনে পড়ে যেত । খুব সত্যি বললে যদিও কঙ্কার সাথে তার হয়ত একটা পরকীয়া সম্পর্কই ছিল কিন্তু সৃঞ্জার থেকেও অনেক বেশি সহজ ছিল মিথিল কঙ্কার কাছে। আসলে তাদের দুজনের মধ্যের চাওয়া পাওয়াটা যে অতটা দুর্বার ছিল না। কিন্তু সেই সব তো চুকে বুকে গেছে নয় নয় করে আজ বছর তিনেক হল। তবে সম্পর্কটা যেমন একদিনে শেষ হয়ে যায় নি তেমনি মিথিলের সব ভুলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসাও অত সহজ হয় নি । … বেশ খানিকটা সময় পার হয়ে গেছিল নিজেকে সব কিছুর বাইরে নিয়ে যেতে, তারপর ধীরে ধীরে নিজের মনটাকে সৃঞ্জাতে সীমাবদ্ধ করতে পেরেছিল মিথিল…একটা সময় পরে সৃঞ্জাকেই জীবনের একমাত্র অবলম্বন ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল সে এই কটা বছরে। অথচ তিন বছর পর আজ হঠাত কি এমন হল যে কঙ্কা নিজে থেকে দেখা করতে চাইছে মিথিলের সাথে ? তাহলে কি কঙ্কা আবার ফিরতে চাইছে নাকি তাদের পুরনো সম্পর্কের বৃত্তে । সে কি আবার ফিরে দেখতে চাইছে পুরোনো দিনগুলোকে । কিন্তু কঙ্কা যে বলেছিল সে আর চায় না এই সম্পর্কটাকে টিকিয়ে রাখতে। একদিকে মিথিল আর একদিকে তার স্বামী বাসব …দুজনের মাঝে সে হাঁফিয়ে উঠেছিল! কঙ্কা তো আরও বলেছিল ,যে বাসব যত খারাপই হোক হাজার হলেও সে তার অগ্নিসাক্ষী করা স্বামী, তার একমাত্র সন্তান বুবুনের বাবা , তাকে অস্বীকার করবে কি করে কঙ্কা! আর মিথিলের সাথে তো পরকীয়া প্রেম…আনকন্ডিশনাল লাভ ! …সম্পর্কটা চালিয়ে যাবার আদৌ কোনও দায়বদ্ধতা ছিল কি কঙ্কার ?ছিল না বোধহয় আর তাই স্বার্থপরের মত নিঃশব্দে মিথিলের হাত ছেড়ে দিয়েছিল কঙ্কা । অবশ্য মিথিলও বলেছিল ,
-দেখ , কঙ্কা জোর করে তো সম্পর্ক রাখা যায় না …অসুবিধে থাকলে তুমি সময় নাও …কিছুদিন দুরত্ব বজায় রাখো, কিন্তু একেবারে সরে যেও না …সত্যি বলতে আমরা দুজনেই সংসারে বাঁধা পড়ে আছি চাইলেও কেউই কিন্তু নিজেদের জায়গা থেকে সরে আসতে পারব না কোনোদিনই …তবু দুজনেই দুজনের কাছে একটা উন্মুক্ত খোলা জানলা…এমন করে জানলাটা বন্ধ করে দিলে আরও গুমরে মরবে কঙ্কা!… কাছে থাকতে হবে না। কিন্তু এমন দুরত্বে কি থাকা যায় না যাতে হাত বাড়ালে ছোঁয়া যায় …একটা পরম নিশ্চিন্ত আশ্রয়!!!… কিন্তু না কঙ্কা রাজি হয়নি । কি যে হয়েছিল ? কে জানে ? শেষমেশ মিথিল বিরক্ত হয়ে বলেছিল,
- ঠিক আছে আমি তোমার কথাই মেনে নিলাম, কিন্তু মনে রেখ, আজ যেমন ভাবে তুমি এড়িয়ে যাচ্ছ , এরপর যদি কোনদিন তুমি ভুল বুঝে ফিরে আসতে চাও ,আমিও কিন্তু তোমাকে চিনতে পারব না।‘’
…কিন্তু কই সকালবেলা ফোনে কঙ্কা নামটা শোনার পর, সে ফোনটা কাটতে পারল না তো ?

……একথা সেকথা ভাবতে ভাবতে আজ মিথিলের একটু দেরিই হয়ে গেল। একবারে স্নান সেরে বেরিয়ে ড্রেসকোর্ট করার সময় আজ এতদিন পর সাদা আর ধুসর রঙের মাফলারটা কেমন যেন গলায় জড়াতে ইচ্ছে করল মিথিলের । একবছর জন্মদিনে কঙ্কা দিয়েছিল তাকে । মাফলারটা নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে একটা লুকোনো চেনা গন্ধ তাকে বারে বারে পুরোনো দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ।মনে মনে এক অমোঘ টান আজও তাকে কঙ্কার প্রতি আকৃষ্ট করে তুলছিল।

-কিগো ব্রেকফাস্ট করবে তো?
-হ্যাঁ চল, হয়ে গেছে , যাচ্ছি।
সৃঞ্জার ডাকে সাতপাঁচ ভাবা বন্ধ করে মাফলারটা গলায় ফেলে ডাইনিং-এ এসে বসল মিথিল। খাবার ততক্ষনে রেডি । মামমাম এসে গলা জড়িয়ে বলল,
- গুড মর্নিং পাপা।
- মর্নিং মামমাম।
- সন্ধ্যেবেলা ফ্লুরিজের কেক আনছো তো? দাদাইও খাবে বলেছে।
- হুম , মনে আছে আমার…আর তার সঙ্গে একটা সারপ্রাইজ গিফটও ।
- পাপা, আজ তো তোমাদের থার্টি ফার্স্টের পার্টি থাকবে , আমি তো মামার বাড়ি থাকব রাতে , আমার সাথে তো তোমার আজ আর দেখাই হবে না , কাল দেখা হবে মামার বাড়িতে। …তুমি কিন্তু প্লিজ দিদুন আর দাদাই এর কাছে কাল তাড়াতাড়ি মাকে নিয়ে পৌঁছে যাবে… একদম আমার ঘুম ভাঙ্গার আগেই …আমি যেন ঘুম থেকে উঠেই তোমাকে দেখতে পাই আর সবার প্রথম হ্যাপি নিউ ইয়ারটা তোমার মুখেই শুনতে পাই।
- ওকে মাই লিটীল অ্যাঞ্জেল। তাই হবে । তুমি কিন্তু আজ দিদুন আর দাদাইকে একদম বিরক্ত করবে না।
সৃঞ্জা বলল,
-তুমি অফিসে পৌঁছে একবার গাড়িটা পাঠিয়ে দিও, আমি মামমামকে মায়ের কাছে রাখতে যাব…মা দুপুরে খেতে বলেছে…আমরা ওখানে পৌঁছে গাড়ি ছেড়ে দেব । বিকেলে আমি একটু পার্লারে যাব। কিন্তু সন্ধ্যেবেলা তুমি কি করবে শুনি ?
-মানে? যাব তো পার্টিতে।
- না তুমি কি আমাকে নিতে আসবে নাকি ,আমি পৌঁছে যাব তোমার অফিসে।
-দেখে নিচ্ছি…মিটিং হয়ে গেলে জানিয়ে দেব । তুমি রেডি হয়ে থেকো। … আর না হয় এক কাজ কর গাড়ি ছাড়তে হবে না, তুমি গাড়িটা রেখ… আমার কাজ মিটে গেলে আমি ফোন করে দেব তুমি গাড়ি নিয়েই চলে এস অফিসে একসাথে বেরিয়ে যাব।
-হুম সেটাই ঠিক হবে…তবে প্লিজ দেরি কর না যেন।
____________________________________ক্রমশ।

  
This entry is part 8 of 8 in the series এখানেই গল্পের শেষ নয়

This content is password protected. To view it please enter your password below:

  
PAGE TOP
HTML Snippets Powered By : XYZScripts.com
Copy Protected by Chetans WP-Copyprotect.