This entry is part 4 of 6 in the series শূন্য থেকে শুরু

পর্ব -৪।

আজ সারা রাত মোহনাকে খেতে দেওয়া হবে না … এটা ভেবেই কেমন যেন খিদে পাচ্ছিল মোহনার…। অথচ কতদিন গেছে মোহনা আবীরের কথা ভেবে ভেবে মন খারাপ করে কিছু খাই নি পর্যন্ত। এটাই বোধহয় মানুষের কমন সাইকোলজি…বাধা দিলেই একটা তীব্র আকাঙ্খা জন্মায়…। আয়ান বিরিয়ানি খেতে ভালবাসে…সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোয় তার প্রায় দিনই বিরিয়ানির বায়না চলে ,কিন্তু  মোহনা রাজি না… ব্যস আয়ানও রাগ দেখিয়ে ঘরে গিয়ে খাব না বলে বসে থাকে…মোহনা হয়ত বাবা বাছা বলে অন্য খাবার খাওয়াতে পারত কিন্তু তা না করে দুজনের খাবার বেড়ে টেবিলে চাপা দিয়ে মোহনা এসে নিজেও না খেয়ে শুয়ে থেকেছে…। আয়ানের রাগ পড়লে যখন ফ্রিজ খুলে খাবার খুঁজতে এসে টেবিলে রাখা খাবার চোখে পড়ে, তখন নিজে থেকেই দুটো ডিশ মায়ের ঘরে নিয়ে গিয়ে বলেছে… ‘কি মুশকিল তুমি কেন খাও নি?…সারাদিন খেটে খুটে আমার রাগের সাথে পাল্লা দিচ্ছ?…নাও আমি খাইয়ে দিচ্ছি ,চলো’…এই বলে এক টুকরো রুটি ছিঁড়ে সবজি দিয়ে মায়ের মুখে ধরেই বলত ‘এবার তুমি একটু খাইয়ে দাও আমায় ।’…আজ মোহনার মনে হচ্ছে সে না বলত বলেই আয়ান অমন বায়না করত…কি ক্ষতি ছিল হ্যাঁ বললে ?  দু তিন দিন খেলে নিজেই হয়ত আর খেতে চাইত না…কিন্তু সত্যি আজ তারও কেমন যেন বিরিয়ানি খেতে ইচ্ছে করছে আয়ানের সাথে…।আয়ানটা যে কি করছে? …বাচ্ছা ছেলে টুয়েলভে উঠেছে সবে…হঠাৎ করে মোহনার এমন অ্যাটাক হওয়াতে ছেলেটা যেন কেমন চুপ মেরে গেছে…। আবীরের বাড়ির সাথে সম্পর্ক তো নেই বললেই চলে…আবীরের বাবা মা কেউই আর বেঁচে নেই…থাকার মধ্যে আছে এক ননদ …মাঝে সাঝে ফোনে কথা হয়…তাও ঐ গা ছাড়া গোছের…থাকেও তো গোরখপুরে…মোহনা কোনও খবরই দেয় নি। আর বাপের বাড়িতে দাদা বউদি নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত…আর মা তো প্রায় বাতেই পঙ্গু…তবুও তার পেসমেকার বসানোর খবরে দাদা এসেছে…আয়ানের সাথে আছে… ডাক্তারের সাথে কথা বলা …ইন্সিওরেন্সের কাগজপত্র রেডি করা…অ্যাডমিসন সব নিয়েই আয়ানকে গাইড করেছে…। সেদিন রাতে তো এটাও বলেছে …

-মৌ তুই কেন একা থাকবি? আমি  বুঝিনা তোর কিসের এত জেদ…আমাদের নিজেদের অতবড়ো বাড়ি থাকতে তুই একা কেন ফ্ল্যাটে পড়ে আছিস? …এ বাড়ি যতটা আমার ততটাই তোর …তুই বাড়িতে থাকলে মারও তো একটু শান্তি হয় …তোরও কথা বলার কেউ থাকে । তুই কিন্তু অপারেশনের পর আয়ানকে নিয়ে বাড়িতেই থাকবি , এই আমি বলে রাখলাম।

-আর আমাদের ফ্ল্যাটের কি হবে শুনি?

-ও নিয়ে পরে ডিসাইড করবি । কবে তোর বউদি তোকে কি বলেছে সেই নিয়ে এত কিসের অভিমান বলত।? অনু নিজেও তার জন্য অনুতপ্ত। আমাদের আর কি আছে বল । নিম্মি রিসার্চ করছে , বাইরে,  এইতো আর একবছর কাটলেই হয়ত রিমোর সাথে বিয়ে করে সেট্‌ল করে যাবে অস্ট্রেলিয়ায়…। তুই আর আয়ান থাকলে আমাদেরও তো ভালো লাগে …আয়ান এত ভালো ছেলে …এত ছোট বয়সে বাবাকে হারিয়েছে… আমাদেরও তো কিছু করার ইচ্ছে করে ওর জন্য।

… মোহনা আর উত্তর করেনি,  চুপ করে শুনেছিল। দাদা কোনদিন তাকে এমন করে বলেনি …তবে সত্যি বলতে সে তো আবীরকে হারিয়ে দাদা বউদির কাছেই উঠেছিল…ছিলও বেশ… মায়ের আদরে,  দাদার স্নেহে মনের মাঝে একটা প্রলেপ গড়ে উঠেছিল… আবীরের কলকাতা অফিসের অনেকেই দেখা করতে এসেছিল…কোম্পানি অফারও করেছিল মোহানাকে চাকরির জন্য…কিন্তু মোহানা চাইনি কারন ইতি মধ্যেই তার  স্কুলে চাকরিটা হয়ে গিয়েছিল ,জয়েনও করে গিয়েছিল।  ধীরে ধীরে সামলেও উঠছিল মোহনা, স্কুল আর আয়ানকে নিয়ে । মাঝে মাঝে আসত আবীরের জুনিয়র জুবিন । জুবিন ভার্গব যদিও অবাঙালি ছেলে কিন্তু ভীষণ ভালোবাসত বাংলা সংস্কৃতি। ওর মুখে ঝরেঝরে বাংলা শুনে কেউ বলবে না, ও বাঙালি নয়। মোহনার সমবয়সি কিংবা একটু ছোটই হবে…কলকাতা অফিসে ওর পোস্টিং হয়েছিল মাস ছয়েক আগেই …আবীরকে কলকাতা আনার ব্যাপারে ওই সবচেয়ে বেশি তৎপর ছিল।..আবীরকে খুব ভালবাসত জুবিন, টাটানগরে থাকতে মাঝে মাঝে একসাথে উইকেন্ড কাটাত ওদেরই সাথে , কমপ্লিট ব্যাচিলার… আবীর মারা যাবার পর কলকাতাতেও তাই জুবিন মাঝে মাঝেই খোঁজ নিতে আসত আয়ান আর মোহনার…  ধীরে ধীরে কেমন যেন একটা ভরসার জায়গা গড়ে উঠছিল মোহনার সাথে । মোহনার দাদা মল্লারেরও  বেশ লাগত জুবিনকে…  দায়িত্বয়ান , স্কলার , হাসমুখ প্রকৃতির ছেলে ছিল জুবিন। অনুজা মানে মোহনার বউদিও খুব পছন্দ করত জুবিনকে। একবছর নিম্মির জন্মদিনে অনুজা জুবিনকে ইনভাইট করেছিল…সারাদিন সবাই মিলে হই হই করে কাটিয়ে বিকেলবেলা জুবিন তার গাড়িতে নিম্মি, আয়ান আর মোহনাকে নিয়ে একটু বেরোলো ।  ঘোরাঘুরি করে ,শপিং করে , আইস্ক্রীম খেয়ে আবার বাড়ি ফিরে এল সবাই । একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল ফিরতে…তাই জুবিন বাড়ির মুখে ওদের নামিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল।  সেদিন মোহনার মনটা বেশ ভালো ছিল। নিম্মি আর আয়ানও খুব খুশি ,তাদের নতুন গিফট নিয়ে নিজেদের মধ্যে বেশ ব্যস্ত ছিল । মোহনার গলায় অনেকদিন পর রবীন্দ্রসঙ্গীতের দুকলি শুনে অনুজা বলেছিল,

-বেশ তো দুটিতে মিলে মিশে গেছ দেখছি…এবার কি একটু নতুন করে জীবনটাকে ভেবে দেখতে পারো না মৌ?

-বউদি । কি বলছ তুমি?

-কেন ভুল কি বলেছি? তোমাকে খুশি দেখলে আমাদেরও ভাল লাগে ।

-তার জন্য নতুন ভাবনার কি আছে?

-আছে বইকি?  এক বছর তো কাটল । একা থাকাটা যে কতটা অভিশাপ তা তো বোঝোই। একবার নতুন করে জুবিনকে নিয়ে ভেবে দেখলে ক্ষতি কি…।

-আমরা খুব ভাল বন্ধু বউদি…এর চেয়ে বেশি কিছুই না… আর প্লিজ তুমি এইসব কথা এরকম ভাবে বলো না…আয়ান শুনলে খুব বাজে ব্যাপার হবে।

-কেন ? আয়ান তো বেশ ভালোবাসে জুবিনকে…

-প্লিজ বউদি আমি এখন এসব নিয়ে ভাবছি না। অনেকদিন পর আজ আয়ানকে খুশি দেখে আমার বেশ হাল্কা লাগছিল …।তাই বোধহয় নিজের অজান্তেই গুন গুন করছিলাম…। কিন্তু তুমি সেটার অন্য মানে করছ।

-না না মৌ …একথা কেন বলছ…আমি কি তোমায় ভালবাসি না…তোমার ভাল থাকা না থাকা কি আমাকে ভাবায় না?

-তা নয় বউদি…তুমি জান না আয়ান কতটা অ্যটাচড্‌ ছিল আবীরের সাথে…

-সব ছেলেমেয়েই অ্যটাচড্‌ থাকে তার বাবা মায়ের সাথে …সেরকম হলে আয়ানকে হোস্টেলে রেখে একটু নিজের মত শ্বাস নিলে ক্ষতি কি? তোমার তো নিজের একটা জীবন আছে নাকি ? তাছাড়া আমরা সবাই জুবিনকে খুব পছন্দ করি…তুমি চাইলে তোমার দাদা কথা বলতে পারে ওর সাথে।

- প্লিজ বউদি …তুমি এসব বলা বন্ধ কর।

অনুজা চুপ করে গেছিল…কিন্তু বিষয়টা থেমে থাকে নি। …

আজকের রাত্রিটা বড়ো দীর্ঘ লাগছে মোহনার…মরফিন ইঞ্জেকশান দেওয়ার পরও ঘুম আসতে চাইছে না ।…সিস্টার বললেন,

-আপনার নার্ভগুলো ভীষন এক্সাইটেড হয়ে আছে ম্যাম…নয়ত এতক্ষনে ঘুম এসে যেত আপনার। ঘুমনোর চেষ্টা করুন…নাহলে আমাকে আবার ডঃ গুপ্তকে ফোন করতে হবে।

-না না …আমি ঘুমনোর চেষ্টা করছি।

মোহনা চোখ বুজে ফেলে…কিন্তু ঘুম কই? মনে মনে ভাবতে থাকে না আর পুরোনো কথা নয় এবার ভাববে নতুন একটা ভোরের কথা…ভোরবেলা অপারেশনের পর আজ সারাদিন  তাকে ICU তে রেখেছিল… কাউকে দেখাও করতে দেয়নি ,  …ডঃ বলেছিলেন কাল কেবিনে শিফট করবে মোহনাকে, কিন্তু সন্ধ্যের পর  ডঃ গুপ্তর নির্দেশে তাকে কেবিনে শিফট করা হয়েছে….. আর কিছুক্ষন আগে হলে দেখা হত আয়ানের সাথে…মোহনা ভাবলো, ‘ছেলেটা বড়ো মুখচোরা …যত চোটপাট খালি মায়ের ওপর…আজ অ্যানাস্থেসিয়ার ঘোরে কেমন যেন আবীরের মতই লাগছিল ওকে …আচ্ছা আজ আবীর থাকলে কি করত ? তার ‘মনে’র এমন অবস্থার কথা শুনলে!!…হয়ত সারাদিন ICUএর সামনে বসে থাকত…সত্যি বলতে আবীর থাকলে হয়ত মোহনার এমন হতই না…।মনে পড়ে যাচ্ছিল আবীরের সাথে সেই ভালোবাসার মুহূর্তগুলো …আবীর মানুষটা ছিল ভীষণ হুড়ে…যা করত সবের মধ্যেই একটা বুদ্ধিদীপ্ততার পরিচয়  থাকত । এমনকি আদরটাতেও একটা অন্যরকম নেশা হয়ে যেত। আবীরের কথা ভাবতে ভাবতে কেমন যেন ঘোর ঘোর লাগে মোহনার …ঘুম এসে যায় কি এক অনাবিল ভালো লাগায় ।

…………………………………………………………………………………………….ক্রমশ

Series Navigation<< শূন্য থেকে শুরু/৩শূন্য থেকে শুরু/৫ >>
© Copyright 2014 @indrila, All rights Reserved. Written For: Oimookh